পুঁজিবাজার ও বীমা খাতে নেতৃত্ব বদলের জোর গুঞ্জন

পুঁজিবাজার ও বীমা খাতে নেতৃত্ব বদলের জোর গুঞ্জন

রাসেল মাহমুদ

২০১০ সালের ধসের পর দেড় দশক পার হলেও দেশের পুঁজিবাজার টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আইন সংশোধন, স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা পৃথকীকরণসহ নানা সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই হারানো পুঁজি ফিরে পাননি। দফায় দফায় লোকসান ও অস্থিরতায় বাজারে আস্থা আরও ক্ষয় হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আর্থিক খাতের শীর্ষ পদগুলোতে পরিবর্তনের আলোচনার মধ্যেই পুঁজিবাজার ও বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব বদলের জোর গুঞ্জন উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়। বাজারেও তার কিছু ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাজার আবার অস্থির হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর শীর্ষপদে পরিবর্তন আনা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর এবার নজর পড়েছে আর্থিক খাতের অন্য দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা—বিএসইসি ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর দিকে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন আসতে পারে—এমন আলোচনা এখন তুঙ্গে।

বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠনে এমন একজন চেয়ারম্যান প্রয়োজন, যিনি বাজার সম্পর্কে গভীর ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন। কেবল তাত্ত্বিক বা আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা নয়, বাস্তব বাজার ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নেতৃত্বই এখন সময়ের দাবি।

জানা গেছে, বিএসইসি চেয়ারম্যান পদে অন্তত ছয়জনের নাম সরকারের উচ্চপর্যায়ে সুপারিশ আকারে পৌঁছেছে। তালিকায় রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কমিশনে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও বাজার–অংশীজনেরা।

আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ–এর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাশরুর রিয়াজ। তিনি বিশ্বব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ। এ ছাড়া দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলামের নামও জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। প্রায় ২৫ বছরের পুঁজিবাজার–অভিজ্ঞতার কারণে তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিক্ষা খাত থেকেও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান। পাশাপাশি ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিচালক ও লংকা বাংলা সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরীর নামও আলোচনায় রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সাবেক কমিশনার ড. এটিএম তারিকুজ্জামান এবং আন্তর্জাতিক হেজ ফান্ড টাইবোর্ন ক্যাপিটালের সহপ্রতিষ্ঠাতা তানভীর গণির নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।

জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পুঁজিবাজারকে ঢেলে সাজানো এবং বাজারকে গতিশীল ও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার দিয়ে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজেদের কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রয়োজনে আরও পরিবর্তন আসতে পারে। তার এই বক্তব্যের পর বিনিয়োগকারী মহলে ধারণা জোরালো হয়েছে, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষপদেও পরিবর্তন আসতে পারে।

অন্যদিকে বীমা খাতেও আস্থাহীনতা গভীর হচ্ছে। দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে অনেক বীমা কোম্পানি সময়মতো দাবি পরিশোধ করছে না—এমন অভিযোগ রয়েছে। ফলে গ্রাহকদের অসন্তোষ বাড়ছে এবং খাতটি চাপে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইডিআরএকে শক্তিশালী করা এখন জরুরি। দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বীমা কোম্পানির সংখ্যা বেশি; অনেক প্রতিষ্ঠান দাবি পরিশোধে গড়িমসি করে এবং নানা অনিয়মে জড়িত—এমন অভিযোগও রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইডিআরএর চেয়ারম্যান হিসেবে ড. এম আসলাম আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময়েও তিনি খাতে আস্থা ফেরাতে সক্ষম হননি—এমন সমালোচনা রয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার পদত্যাগের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।

আইডিআরএর সম্ভাব্য চেয়ারম্যান হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. জালালুল আজিম, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সাবেক এমডি দাস দেব প্রসাদ এবং রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স পিএলসির সিইও মো. খালেদ মামুন। এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক আমলা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকেও নিয়োগ আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে পুঁজিবাজার ও বীমা—দুই খাতেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখন আলোচনার কেন্দ্রে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও স্বচ্ছ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা গেলে তবেই এই দুই খাতে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।

BD Short News 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *