ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল, তবে কি বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের সমীকরণ?

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল, তবে কি বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের সমীকরণ?

ইরানের কিছু তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মূলত ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে বিরূপ প্রভাব তৈরি হয়েছে তা নিয়ন্ত্রণে আনতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে রপ্তানির উদ্দেশ্যে সমুদ্রের বিভিন্ন জাহাজে আটকে থাকা ইরানি তেল বিক্রির অনুমতি দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বল্পমেয়াদী নির্দেশনা জারির ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।

এ পদক্ষেপকে দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। যদিও এ থেকে কতটা সুফল মিলবে তা এখনও অনিশ্চিত।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর খুব একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বরং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের শিকার ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে অর্থ আয়ের মাধ্যমে তহবিল গঠনের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেই মনে করেন তারা।

এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে।

শুক্রবার বেসেন্ট জানান, এ অনুমতি শুধুমাত্র বর্তমানে জাহাজে বোঝাই থাকা ইরানে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এছাড়া এ অনুমোদন আগামী ১৯শে এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলেও জানিয়েছে মার্কিন অর্থ দপ্তর।

যুদ্ধের আগে, ইরান থেকে সরবরাহ করা তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল চীন। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে খুব কম দামে এই তেল কিনে নিত বেইজিং।

বৃহস্পতিবার ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ইরানের জ্বালানি বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ফলে ভারত, জাপান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর আরও বেশি তেল পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। একই সাথে চীনকেও প্রকৃত ‘বাজার দর’ পরিশোধে বাধ্য করবে এই সিদ্ধান্ত।

কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় তেল বিক্রির অর্থ যাতে ইরান সরকারের হাতে না পৌঁছায় সে বিষয়ে কোনো নিয়ম থাকবে কিনা, তা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি বেসেন্ট।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসেস-এর পরিচালক ডেভিড ট্যানেনবাম বৃহস্পতিবার বিবিসিকে বলেন, “সহজ কথায় বলতে গেলে, এটা একটা উদ্ভট ব্যাপার।”

মূলত আমরা ইরানকে তেল বিক্রি করার অনুমতি দিচ্ছি, যা পরবর্তীতে যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এই পরিকল্পনা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে কিনা এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “দাম অপরিবর্তিত রাখতে যা যা করা প্রয়োজন, আমরা তাই করব।” এদিকে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন যে, এই ছাড়ের ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর তেমন প্রভাব পড়বে না।

মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’-এর সহযোগী সিনিয়র ফেলো র‌্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, “আমি মনে করি না এই সিদ্ধান্তের ফলে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে। বরং এর ফলে অনেক প্রশ্ন সামনে চলে আসছে।” এই তেল বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ইরান সরকারের কাছে যাক, যুক্তরাষ্ট্র এমনটি চাইবে বলে মনে করেন না মি. জিয়েম্বা। কিন্তু বাস্তবে এটি ঠেকানো কঠিন হতে পারে বলেই মনে করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “ব্যাপক সরবরাহ ঘাটতির কারণে মার্কিন সরকার এখন এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছে যেখানে প্রতিটি ব্যারেলই গুরুত্বপূর্ণ। আর এ কারণেই তারা যেখানেই সম্ভব অতিরিক্ত তেল খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।”

গত সপ্তাহে রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার পাশাপাশি নিজেদের কাছে মজুদ থাকা লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেলের মজুদও ছেড়ে দিয়েছে তারা। যদিও রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি ইউরোপের নেতাদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিল।

ইউরোপের নেতারা বলেছিলেন যে, এ সিদ্ধান্ত ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনকে শক্তিশালী করবে এবং ইউক্রেনের যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করবে।

বিশ্বে প্রতিদিন যে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহার হয়, তার পাঁচ ভাগের প্রায় এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে, যা ইরানের উপকূল বরাবর অবস্থিত। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এ রুট দিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কিছু তেল বিকল্প পথে পাঠানো হলেও, যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে প্রায় ১০ শতাংশ সরবরাহ কমে গেছে বলেই অনুমান বিশেষজ্ঞদের।

ইরান ও কাতারের যৌথ মালিকানাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও জ্বালানি সরবরাহের এই ঘাটতি আরও কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

BD Short News 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *