টিটন হত্যা: ৫ দিনেও শনাক্ত হয়নি খুনিরা, সন্দেহ আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্ব
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন মোহাম্মদপুর এলাকার ‘সিটি অব গড’খ্যাত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং সানজিদুল ইসলাম ইমন। পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক প্রভাবশালী সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফের নামও।
জানা গেছে, টিটনসহ সন্দেহভাজন এই তিন সন্ত্রাসী নব্বইয়ের দশকে মোহাম্মদপুর এলাকায় একসঙ্গে বেড়ে ওঠেন। তাদের মধ্যে ইমন ছিলেন টিটনের ভগ্নিপতি। দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্র ব্যবসা ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে বিরোধ চলছিল।
সূত্র আরও জানায়, সম্প্রতি বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে টিটনের দ্বন্দ্ব তীব্র হয়। অন্যদিকে, ইমনের সঙ্গে অস্ত্র ব্যবসা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ ছিল পুরোনো। এছাড়া জোসেফের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি ছিলেন টিটন—এ কারণেও প্রতিশোধের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
তবে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিচ্চি হেলাল। তিনি দাবি করেন, টিটনের সঙ্গে তার ‘চমৎকার সম্পর্ক’ ছিল এবং তাকে বন্ধু হিসেবে ভালোবাসতেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু অনলাইন গণমাধ্যম বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে তার নাম সামনে আনা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি রমনা জোনের ডিসি মো. মাসুদ আলম বলেন, “কে বা কারা, কেন টিটনকে হত্যা করেছে—এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। সঠিক তথ্য পেতে সবাইকে কিছুটা সময় দিতে হবে।”
পুরোনো ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তালিকায় টিটন
সূত্র জানায়, ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর একটি তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে টিটনের নাম ছিল ২ নম্বরে। তাদের ধরিয়ে দিতে দেশজুড়ে পুরস্কার ঘোষণাসহ পোস্টারও সাঁটানো হয়েছিল।
ফুটবলার থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় প্রতিভাবান ফুটবলার ছিলেন টিটন। ১৯৮৬-৮৭ সালে যশোরে কোচ ইমদাদুল হক সাচ্চুর তত্ত্বাবধানে খেলতেন তিনি। পরবর্তীতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৯৮ সালে দলীয় কোন্দলে গুরুতর আহত হওয়ার পর অপরাধজগতে প্রবেশ করেন। ১৯৯৯ সালে যশোরে জোড়া খুনের ঘটনায় জড়িয়ে ঢাকায় এসে আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রভাব বিস্তার করেন।
মোহাম্মদপুরের হারিছ-জোসেফ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় নিজের আধিপত্য গড়ে তোলেন টিটন।
কে এই ‘ক্যাপ্টেন’ ইমন?
সানজিদুল ইসলাম ইমন, যিনি ‘ক্যাপ্টেন ইমন’ নামে পরিচিত, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘সৌখিন সন্ত্রাসী’ হিসেবে পরিচিত। স্বনামধন্য চিকিৎসক দম্পতির সন্তান ইমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
১৯৯৯ সালে ধানমন্ডি এলাকায় তার অপরাধজগতের যাত্রা শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৩০টির বেশি হত্যা মামলা রয়েছে। আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তার নাম জড়িয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ইমন তার সহযোগী মামুনকে নিয়ে ‘ইমন–মামুন’ নামে একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন, যা একসময় রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে বড় প্রভাব বিস্তার করে।
দুই দশকেরও বেশি সময় আন্ডারওয়ার্ল্ড ও কারাগারে কাটানোর পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন টিটন। তবে শেষ পর্যন্ত গুলিতেই তার জীবনের ইতি ঘটে।
টিটন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
