গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের জোড়া ধাক্কায় ছুটির দিনেও স্বস্তি নেই চট্টগ্রামে

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের জোড়া ধাক্কায় ছুটির দিনেও স্বস্তি নেই চট্টগ্রামে

সপ্তাহের কাজের ব্যস্ততা শেষে শুক্রবার মানেই একটু স্বস্তির দিন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো আর ভালো খাবারের আয়োজন থাকে এই দিনে। কিন্তু চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের বাসিন্দাদের এবারের শুক্রবারের চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের জোড়া ধাক্কায় নাকাল নগরবাসী।

একদিকে গ্যাসের অভাবে জ্বলছে না রান্নার চুলা, অন্যদিকে বিদ্যুতের ঘন ঘন যাওয়া-আসায় ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। এর প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের ওপরও; আয়ের আশায় রাস্তায় নেমে ছুটির দিনটি তাদের কাটছে পাম্পের দীর্ঘ লাইনে প্রহর গুনে।

সকাল থেকেই বেশির ভাগ বাসাবাড়িতে গ্যাসের চুলা জ্বলেনি। যেখানে জ্বলেছে সেখানে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না তো দূরের কথা, পানি গরম করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবারকে বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় টান পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। সব মিলিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎহীন গরমে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

একসঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। কাজীর দেউড়ি এলাকার গৃহিণী কুমকুম আজাদ বলেন, ‘সকাল থেকে চুলায় গ্যাসের দেখা নেই। চাপ এতটাই কম যে পানি ফোটানো তো দূরের কথা, গরম করাই দায়। বাধ্য হয়ে পরিবারের জন্য বাইরে থেকে কেনা খাবারের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে।’

একই চিত্র সাব এরিয়া ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতেও। সেখানকার বাসিন্দা ঝর্ণা বেগম বলেন, ‘গ্যাসের অভাবে রান্না বন্ধ, আবার রাতে গরমে বিদ্যুতের জন্য চোখে ঘুম নেই। শিশু আর বৃদ্ধদের নিয়ে ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়েছে।’

বহদ্দারহাট এলাকার এক বাসিন্দার আক্ষেপও একই রকম। তিনি বলেন, ‘সারা সপ্তাহ কাজের পর শুক্রবারে পরিবার নিয়ে একটু ভালো-মন্দ খাওয়ার সুযোগ থাকে। অথচ আজ সকাল থেকে একটুও গ্যাস নেই। বাচ্চারা ঘরে, বৃদ্ধ বাবা-মা ঘরে– সবাইকে নিয়ে এখন চরম বিপদে আছি। শেষ পর্যন্ত হোটেল থেকে চড়া দামে খাবার কিনে আনতে হলো।’

গ্যাস ও বিদ্যুতের এমন অনিশ্চয়তায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও। শিক্ষিকা সুলতানা কাজী বলেন, ‘কোনো কিছুরই স্থিরতা নেই। কখন গ্যাস আসবে আর কখন বিদ্যুৎ যাবে, তা কেউ বলতে পারছে না। বাচ্চারা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা একেবারেই থমকে গেছে।’

গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতেই নয়, পড়েছে পরিবহন খাতেও। সরেজমিনে নগরের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। মূল সড়ক ছাড়িয়ে লাইন চলে গেছে ভেতরের গলিতেও।

মইজ্জ্যারটেক এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষারত অটোরিকশাচালক রহিম উল্লাহ বলেন, ‘শুক্রবার দিনটায় ভেবেছিলাম অন্য দিনের ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নেব। মানুষ একটু ঘুরতে বের হয়, ভাড়া ভালো পাওয়া যায়। কিন্তু রাত থেকে লাইনেই ৭-৮ ঘণ্টা পার করে দিলাম। গ্যাস না পেলে গাড়ি চালাব কীভাবে, আর পরিবারকেই বা কী খাওয়াব?’

আরেক চালক মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘গ্যাস নিতে এসে দিনের অর্ধেক সময় লাইনেই শেষ। গাড়ি না চালালে সংসার চলবে কী করে? এভাবে চলতে থাকলে তো না খেয়ে থাকতে হবে।’

চালকদের আয়ের পথ কীভাবে বন্ধ হচ্ছে, তা উঠে এসেছে হেলাল উদ্দিন নামের আরেক চালকের কথায়। তিনি বলেন, ‘যাত্রী নিয়ে নামার আগেই তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে বসে থাকতে হয়। অথচ দিন শেষে মহাজনকে গাড়ির জমা ঠিকই দিতে হচ্ছে। সংসারের খরচ চালাব কী দিয়ে, বুঝে উঠতে পারছি না।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরেই দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমছিল। গত বৃহস্পতিবার সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সোমবার থেকে তা আবার কমে যায়। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন আসা এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে গ্যাস খালাস করা সম্ভব হয়নি। এতে সামিটের টার্মিনাল থেকে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিনের মোট গ্যাস সরবরাহ ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে। ফলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডসহ (কেজিডিসিএল) বিতরণকারী কোম্পানিগুলো সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

গ্যাসের এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। পিডিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে যেখানে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট, সেখানে রাতে চাহিদা কিছুটা কমলেও ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না পেলে আমাদের পক্ষেও কেন্দ্রগুলোতে শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।’

গ্যাস সংকটে গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছে কেজিডিসিএল। প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, ‘মহেশখালী থেকে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ উন্নতি সম্ভব নয়। বিষয়টি আমরা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগেই নগরবাসীকে জানিয়েছি।’

প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন জানান, শুক্রবার মধ্যরাতেই মহেশখালীর টার্মিনাল থেকে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের মধ্যেই বন্দরনগরীর এই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *