কেন মহানবী (সা.) ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’

কেন মহানবী (সা.) ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’

ধর্ম ডেস্ক

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি শব্দ ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’। এর অর্থ—সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)

কেন তাঁকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত বলা হয়েছে? তাঁর জীবন, শিক্ষা ও মানুষের প্রতি আচরণের দিকে তাকালে এর উত্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাওহিদের পথে আহ্বান

মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে নবুয়ত লাভ করেন, যখন আরব সমাজে শিরক, গোত্রীয় সংঘাত, জুলুম ও নানা সামাজিক অনাচার বিস্তৃত ছিল। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন। পাশাপাশি সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দেন।

তিনি বংশ, সম্পদ বা ক্ষমতাকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। বরং মানুষে মানুষে মর্যাদা ও সাম্যের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর দাওয়াত শুধু মানুষের বিশ্বাসে পরিবর্তন আনেনি, চরিত্র ও সামাজিক জীবনেও ব্যাপক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।

শত্রুর প্রতিও ক্ষমা

মহানবী (সা.)-এর রহমতের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তায়েফের ঘটনা। তায়েফবাসীর নির্যাতনে তিনি রক্তাক্ত হয়েছিলেন। এরপর পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বরং আশা প্রকাশ করেন, তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ আসবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। (সহিহ বুখারি: ৩২৩১)

মক্কা বিজয়ের দিনও তাঁর সামনে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ ছিল। দীর্ঘ নির্যাতন, সামাজিক বয়কট ও ঘরছাড়া জীবনের পর সেই মক্কাই তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু বিজয়ের মুহূর্তে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাকে প্রাধান্য দেননি। ক্ষমার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত শক্তির পরিচয় প্রতিশোধে নয়, মহানুভবতায়।

উম্মতের জন্য গভীর দরদ

নিজ উম্মতের কল্যাণ নিয়ে মহানবী (সা.)-এর ব্যাকুলতার কথাও কোরআন-হাদিসে এসেছে। তিনি মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে কতটা আগ্রহী ছিলেন, তা বোঝাতে নিজেকে এমন ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যিনি আগুন থেকে মানুষকে রক্ষা করতে তাদের টেনে ধরছেন, অথচ তারা তাঁর হাত থেকে ছুটে যাচ্ছে। (সহিহ মুসলিম)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী।’ (সুরা তাওবা: ১২৮)

মানুষ যেন দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হতে পারে, সে জন্য তিনি উম্মতকে সতর্ক করেছেন, সৎপথের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর দাওয়াতের মধ্যে ছিল মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের গভীর আকাঙ্ক্ষা।

এতিম ও দুর্বলদের জন্য আশ্রয়

মহানবী (সা.) নিজেও শৈশবে পিতাকে হারিয়ে এতিম হয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। তাই এতিমদের প্রতি তাঁর মমতা ছিল গভীর। তিনি বলেছেন, ‘আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এ দুটির মতো।’ এরপর তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইশারা করেন। (সহিহ বুখারি)

নারী, কন্যাশিশু, দাস, দরিদ্র ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপরও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। অধীনস্থদের নিজেদের মতো খাবার ও পোশাক দেওয়ার এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ না দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।

সমাজে যারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিল, তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েও তাঁর রহমতের প্রকাশ ঘটেছে।

প্রাণীকুলের প্রতিও দয়া

মহানবী (সা.)-এর রহমত শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাণীদের প্রতিও দয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন তিনি। হাদিসে এসেছে, প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর প্রতি দয়ার মধ্যেও সওয়াব রয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৬০০৯)

একবার একটি উটের দুরবস্থা দেখে তিনি তার মালিককে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ দেন। তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তির ক্ষমা পাওয়ার ঘটনাও তিনি সাহাবিদের জানিয়েছেন।

এসব শিক্ষা থেকে স্পষ্ট হয়, সৃষ্টির প্রতি দয়া একজন মুমিনের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজও প্রাসঙ্গিক তাঁর রহমতের শিক্ষা

‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ শুধু একটি সম্মানসূচক পরিচয় নয়; এটি মহানবী (সা.)-এর জীবন ও দাওয়াতের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তাওহিদের পথে মানুষকে আহ্বান, শত্রুর প্রতি ক্ষমা, উম্মতের কল্যাণে গভীর দরদ, এতিম ও দুর্বলদের অধিকার রক্ষা এবং প্রাণীর প্রতিও দয়া—তাঁর জীবনের নানা ক্ষেত্রে এই রহমতের প্রকাশ দেখা যায়।

আজকের বিভক্ত ও অশান্ত পৃথিবীতেও মহানবী (সা.)-এর এসব শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর প্রতি ভালোবাসা শুধু তাঁর নাম স্মরণ বা প্রশংসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর দয়া, ন্যায়বোধ, ক্ষমাশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা নিজের জীবনেও ধারণ করাই সেই ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ।

আল্লাহ তাআলা যে মহানবী (সা.)-কে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁর জীবন ও আদর্শে সেই রহমতের বাস্তব প্রতিফলনই পাওয়া যায়।

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *