মা আমেনার কোলে জন্ম নেওয়া সেই শিশু, যাঁর অপেক্ষায় ছিল পৃথিবী
ধর্ম ডেস্ক
আরব সমাজ তখন ধর্মীয় বিভ্রান্তি, গোত্রীয় সংঘাত ও নানা সামাজিক অনাচারে জর্জরিত। মক্কার পবিত্র কাবা, যা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর তাওহিদের স্মৃতিবাহী, সেখানে মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। গোত্র ও বংশের মর্যাদা ছিল সামাজিক অবস্থানের বড় নিয়ামক। শক্তিশালীদের প্রভাবের কারণে দুর্বলরা অনেক সময় তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো।
এমন এক সমাজেই কোরাইশের বনু হাশেম পরিবারে জন্ম নেন মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.)। পরবর্তী সময়ে তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও উত্তম চরিত্রের দিকে আহ্বান করেন।
তবে তৎকালীন আরব সমাজে সব ভালো গুণ বিলীন হয়ে যায়নি। সাহস, অতিথিপরায়ণতা, উদারতা, আত্মমর্যাদা ও বাগ্মিতার মতো গুণও তাদের মধ্যে ছিল। মূল সংকট ছিল বিশ্বাস ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে।
জন্মের আগেই পিতৃহারা
মহানবী (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন বনু হাশেমের সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর মা আমেনা বিনতে ওয়াহাব ছিলেন কোরাইশের বনু জুহরা গোত্রের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান।
বিয়ের পর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি তাঁদের সংসার। ব্যবসায়িক সফরে শামের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন আবদুল্লাহ। ফেরার পথে ইয়াসরিবে অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তখন আমেনা ছিলেন সন্তানসম্ভবা।
অর্থাৎ পৃথিবীর আলো দেখার আগেই পিতাকে হারান মুহাম্মদ (সা.)। জন্মের পরও পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিলেন তিনি।
সেই সোমবারের সকাল
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে মতভেদ রয়েছে। তবে তাঁর জন্ম যে সোমবার হয়েছিল, তা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত।
হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, এ দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এ দিনই তাঁর ওপর ওহি নাজিল হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
মক্কার সেই সোমবারে জন্ম নেন মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব নাতিকে কাবাঘরে নিয়ে যান এবং তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’। আরবি ভাষায় যার অর্থ প্রশংসিত।
আমেনার ঘরে সেই নবজাতক
জন্মের পর মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম আশ্রয় ছিলেন তাঁর মা আমেনা। পিতৃহারা এই শিশুকে ঘিরেই শুরু হয় তাঁর জীবনের প্রথম অধ্যায়।
তাঁর জন্মের সময় কিছু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা বিভিন্ন সীরাত ও ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া যায়। এর মধ্যে আমেনা (রা.)-এর একটি নূর দেখার বর্ণনাও রয়েছে। তবে এসব বর্ণনার সনদ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাই প্রমাণিত তথ্যের সঙ্গে দুর্বল বা বিতর্কিত বর্ণনার পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
মরুর কোলে শৈশব
তৎকালীন আরব সমাজের প্রচলন অনুযায়ী সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিশুদের অনেক সময় শহরের বাইরে মরু অঞ্চলে দুধমায়ের কাছে লালন-পালনের জন্য পাঠানো হতো। মুহাম্মদ (সা.)-কেও বনু সাদ গোত্রের হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে পাঠানো হয়।
মরুর নির্মল পরিবেশে তাঁর শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে। হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর পরিবারে তাঁর আগমনকে ঘিরে বরকতের বিভিন্ন বর্ণনাও সীরাতের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়।
ছয় বছরেই হারালেন মা
ছয় বছর বয়সে মা আমেনা তাঁকে নিয়ে ইয়াসরিবে যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর মক্কায় ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে আমেনা ইন্তেকাল করেন।
মায়ের মৃত্যুর পর ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)-এর দায়িত্ব নেন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু মাত্র দুই বছর পর, আট বছর বয়সে দাদাকেও হারান তিনি। এরপর চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন।
শৈশবের এসব বেদনাময় অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাঁর মানবিকতার প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতিম ও অসহায় মানুষের প্রতি তিনি বিশেষ যত্নের শিক্ষা দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন।’ (সুরা দুহা: ৬)
যে শিশু হয়ে উঠলেন ‘আল-আমিন’
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য মক্কার মানুষের আস্থা অর্জন করেন মুহাম্মদ (সা.)। নবুয়ত লাভের আগেই তিনি ‘আল-আমিন’—অর্থাৎ বিশ্বস্ত—হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া ও ন্যায়বোধ ছিল তাঁর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী সময়ে নবুয়তের দায়িত্ব পাওয়ার পর মানুষের প্রতি তাঁর দাওয়াতেও এসব গুণের প্রতিফলন ঘটে।
আমেনার কোলে সেই শিশু
আমেনার কোলে জন্ম নেওয়া সেই শিশুর শৈশব ছিল বেদনায় ঘেরা। জন্মের আগেই পিতাকে হারিয়েছেন, ছয় বছর বয়সে হারিয়েছেন মাকে, এরপর দাদা আবদুল মুত্তালিবের ছায়াও সরে গেছে। চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে তিনি বেড়ে ওঠেন।
ব্যক্তিগত জীবনের এসব কষ্ট তাঁকে মানুষের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে। পরবর্তী সময়ে তিনি এতিমের অধিকার, দরিদ্রের মর্যাদা, প্রতিবেশীর হক, নারীর সম্মান এবং দুর্বল মানুষের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেন।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)
সেই শিশুর হাত ধরে নতুন পথ
চল্লিশ বছর বয়সে হেরা গুহায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। শুরু হয় নবুয়তের দায়িত্ব এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানের নতুন অধ্যায়।
তিনি মানুষকে মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন। গোত্র, বংশ ও সম্পদের অহংকারের পরিবর্তে তাকওয়াকে মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরেন। এতিম, দরিদ্র, নারী ও দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেন।
সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, দয়া ও ন্যায়বিচারকে মানুষের চরিত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে শিক্ষা দেন তিনি।
এভাবেই আমেনার ঘরে জন্ম নেওয়া সেই শিশু পরিণত হন আল্লাহর রাসুলে। তাঁর দাওয়াত আরব সমাজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সামাজিক জীবনে গভীর পরিবর্তন নিয়ে আসে।
যাঁর জীবন সর্বযুগে অনুসরণীয়
মহানবী (সা.)-এর জন্মের কথা স্মরণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর জীবন ও আদর্শকে জানা এবং অনুসরণ করা। তিনি মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন, দুর্বলদের কীভাবে দেখেছেন, বিরোধীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছেন এবং ক্ষমতা পেয়েও কীভাবে ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন—এসবই তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)
তাই আমেনার কোলে জন্ম নেওয়া সেই শিশু শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের নাম নন। তাঁর জীবন ও চরিত্র একজন মুসলমানের জন্য বিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিক আচরণের অনুসরণীয় আদর্শ।
