দীপের তথ্যে গোলকধাঁধা, খোঁজ চলছে তাহসিফের সঙ্গে থাকা তরুণীর
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে এক তরুণীকে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে যেতে দেখা গেছে সিসিটিভি ফুটেজে। ওই সময় তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপও সেখানে ছিলেন। তবে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তরুণী কোথায় গিয়েছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা।
এদিকে জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বিশেষ করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তুরাগ নদ-সংলগ্ন একটি মাঠে যাওয়ার কারণ এবং সেখানে তাদের সঙ্গে আর কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়ে একেক সময় একেক রকম তথ্য দিয়েছেন তিনি। ফলে ওই তরুণীর পরিচয় শনাক্ত এবং ঘটনার রাতের পুরো গতিবিধি জানার চেষ্টা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে মাদক ও নারী সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নাকি দুর্ঘটনা—তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। দীপের দেওয়া কোনো তথ্যই যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা হচ্ছে না। পাশাপাশি তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ কললিস্ট ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
সিসিটিভি ফুটেজে তরুণীসহ তিনজন
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে পৌঁছান তাহসিফ, দীপ ও এক তরুণী। তারা মোটরসাইকেলে সেখানে যান। পরে আরেকটি মোটরসাইকেলে করে দীপকে সেখানে পৌঁছাতে দেখা যায়। এরপর তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন।
রেস্টুরেন্টের আরেকটি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও ওই তরুণী লিফটের সামনে অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে আসেন দীপ। এরপর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়। পরে মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান তারা।
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তিনজন কোথায় গিয়েছিলেন, তা জানতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশের একাধিক ইউনিট। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাহসিফ ওই তরুণীকে কোথায় নামিয়ে দিয়েছিলেন, তা এখনো জানা যায়নি। এরপর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ওই তরুণী কতক্ষণ তাদের সঙ্গে ছিলেন, কোথায় নেমে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নৌ-পুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রেস্টুরেন্টে এক তরুণীসহ তাহসিফ ও দীপের প্রবেশের ভিডিও তারা দেখেছেন। তবে ওই নারীর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তার পরিচয় পাওয়া গেলে অনেক রহস্যের জট খুলতে পারে। মামলাটি তদন্তাধীন এবং দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। রিমান্ডে এনে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
মাজার বস্তির মাঠে যাওয়া নিয়ে দীপের ভিন্ন বক্তব্য
পিবিআই সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে দীপের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা তুরাগ নদ-সংলগ্ন মাজার বস্তি মাঠে কেন গিয়েছিলেন। এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন।
একপর্যায়ে দীপ দাবি করেন, তিনি ওই মাঠে যাননি। তাহসিফ তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি সেখানে যাবেন। পরে তদন্তকারীরা জানতে চান, মাঠে না গেলে মোটরসাইকেলটি সেখানে কোন জায়গায় ছিল, তা তিনি কীভাবে জানলেন।
এ প্রশ্নের পর দীপ আবার বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, তিনি মাঠে গিয়েছিলেন। তাহসিফ তাকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে নিয়ে যান। তবে আগে থেকে ওই মাঠটি তার চেনা ছিল না।
কিন্তু সেখানে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি দীপ। তাদের সঙ্গে কোনো নারী বা অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীপ শান্তভাবে প্রশ্নের উত্তর দিলেও তার বক্তব্যের অসংগতির কারণে তদন্তে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এক কর্মকর্তা জানান, টঙ্গীর মাজার বস্তি-সংলগ্ন ওই মাঠে মাদক সেবনের ঘটনা ঘটে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগেও অভিযান চালিয়েছে। তাহসিফ ও দীপ মাদকসংক্রান্ত কোনো কারণে সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ঢাকা থেকে টঙ্গীর ওই এলাকায় যাওয়ার কারণ নিয়ে দীপের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে।
ঘটনার তথ্য গোপন করেছেন কি না, খতিয়ে দেখছে পিবিআই
ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে নিজের অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমে এক ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন দীপ। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, উত্তরার রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার শেষে দুজন আলাদা পথে বাসার উদ্দেশে রওনা হন। তবে পরে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, দীপের বক্তব্যে ঘটনার কিছু তথ্য আড়াল করার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি তদন্তকারী সংস্থা।
পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান জানান, দীপের সর্বশেষ বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে তার দেখানো মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। মোটরসাইকেলটির নম্বরপ্লেট ছিল না। ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরের মাধ্যমে বিআরটিএ থেকে এর প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা হবে।
দীপ কেন একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে সেখানে যাওয়ার পর তাহসিফকে রেখে দীপ কেন একা চলে গেলেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
পিবিআই কর্মকর্তা আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বলেছেন, তারা দুজন উত্তরার দিক থেকে মোটরসাইকেলে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। পরে কোনো একপর্যায়ে তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান দীপ। রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে তিনি বাসায় পৌঁছান বলে জানা গেছে।
রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে
রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিক তদন্তে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া জামিনে মুক্তি পেলে তিনি পলাতক হয়ে তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার রহস্য উদ্ঘাটন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের স্বার্থে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সামনে আসছে নতুন প্রশ্ন
মাদকস্পট হিসেবে পরিচিত টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফ ও দীপ কেন গিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে যাওয়ার পর পুলিশের পোশাক পরা দুজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। এতে তাহসিফ পানিতে পড়ে যান। আর দীপ লুকিয়ে থেকে পরে বাসায় ফিরে আসেন।
তবে দীপের এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা। সাঁতার জানা থাকার পরও তাহসিফ কেন পানিতে পড়ে তীরে উঠতে পারেননি, তিনি কী পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তিন দিন পর বাবার মামলা
ঘটনার পর মামলা করতে অনীহার কথা জানালেও ছেলের মৃত্যুর তিন দিন পর শুক্রবার রাতে উত্তরখান থানায় হত্যা অভিযোগে মামলা করেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) উত্তরায় নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাহসিফের বাবা বলেন, তার ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান তিনি।
তিনি বলেন, দীপ যা বলেছেন এবং করেছেন, সেগুলো প্রশ্নবিদ্ধ। এর সঙ্গে কে জড়িত বা কে কী করেছেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
তাহসিফের বাবার দাবি, দীপের সঙ্গে তার ছেলের বেশ কিছুদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। দীপ তাদের বাসায় যাতায়াত করতেন এবং একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়াও করতেন। পরিবারের সদস্যরা তাকে ছোট ছেলের মতোই দেখতেন।
তিনি আরও বলেন, পিবিআইয়ের তদন্তের কিছু অংশ তিনি দেখেছেন। সেখানে দীপ পরবর্তী সময়ে স্বীকার করেছেন, তারা একসঙ্গে টঙ্গীতে গিয়েছিলেন। অথচ দীপ তাকে বলেছিলেন, তাহসিফকে একটি কম্পাউন্ডের মধ্যে রেখে এসেছেন। এসব বিষয় তার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ মনে হচ্ছে।
তাহসিফের আইফোন যেভাবে সচল হয়
টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিন জানান, তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের সময় তার সঙ্গে একটি মানিব্যাগ, হাতঘড়ি ও বন্ধ আইফোন পাওয়া যায়। তখন মরদেহের পরিচয় জানা যায়নি। পরিচয় শনাক্তে কাজ করছিল নৌ-পুলিশ।
পরে আইফোনটি চার্জে লাগানোর পর সচল হয়। ফোনটিতে একটি কল আসে। অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের স্বজন পরিচয় দেন। তার সঙ্গে কথা বলেই পুলিশ সদস্যরা নিশ্চিত হন, নদ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির।
পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে ময়নাতদন্তের নমুনা
শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফের মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় তার পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়টি ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কারণ বলা সম্ভব নয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তাহসিফ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সাধারণত তার সাঁতার জানার কথা। সে ক্ষেত্রে তিনি এমন কোনো পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে সাঁতরে তীরে ওঠার সক্ষমতা ছিল না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
রক্ত, পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের পাশাপাশি তাহসিফ কোনো মাদক বা নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, পরীক্ষার মাধ্যমে তা জানা যেতে পারে। শনিবার প্রতিবেদন পাওয়ার কথা রয়েছে।
