বিক্ষোভ-সহিংসতা মোকাবিলায় ফ্রান্সে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

বিক্ষোভ-সহিংসতা মোকাবিলায় ফ্রান্সে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতা মোকাবিলায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশের পাশাপাশি এলিট ইউনিট, অশ্বারোহী পুলিশ, হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বিক্ষোভে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনার পর এবার নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। গত শনিবারের তুলনায় এবার প্রায় ১০ হাজার বেশি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

শুক্রবার দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, বিক্ষোভ ঘিরে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, সহিংসতা, লুটপাট ও দাঙ্গায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে আগে থেকে জারি করা কারফিউও বহাল থাকবে।

সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জন্য উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। তাঁর অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী অনলাইনে সরকারি ভবনকে লক্ষ্যবস্তু করার আহ্বান জানাচ্ছে। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সংগঠন সরকারের বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছে।

বিক্ষোভে বিধিনিষেধ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ঘোষণা দেন, শনিবার কেবল শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন গোষ্ঠীও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে।

ফ্রান্সের জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন ইউএনইএফ শনিবার সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সরকারবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরাও প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে পদযাত্রার পরিকল্পনা করেছেন। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ এসব কর্মসূচির অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে নির্দিষ্ট পথে সীমিত পরিসরে বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছে। ইউএনইএফ জানিয়েছে, তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সরকার বিক্ষোভের স্বাধীনতা সীমিত করছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, সহিংসতা ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কড়াকড়ি

রাজধানী প্যারিসে রাতের কারফিউ সোমবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিওঁর কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে কারফিউ ও গণপরিবহন চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

উপকূলীয় শহর মার্সেইতে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হলেও বিশেষ বিবেচনায় শ্রমিক ইউনিয়নের একটি মিছিলের অনুমতি দেওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, অরলিয়ঁ শহরে বিরোধীদলীয় নেত্রী মেরিন ল্য পেনের কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালির দলীয় কংগ্রেস ঘিরে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শহরের কেন্দ্রস্থলে জমায়েত হতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও। প্রধান শহরগুলোতে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। শনিবার প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর ও লুই ভুইতোঁ ফাউন্ডেশন বন্ধ রাখার কথা রয়েছে। আর্ট বাসেল মেলাও নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ

ফরাসি সরকারের আরোপ করা বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকারকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অস্ত্রের আঘাতে শিক্ষার্থী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের গুরুতর আহত হওয়ার খবরেও উদ্বেগ জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা মারিলিস লিওঁর মতে, জনগণের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ বিবেচনায় না নিয়ে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবারের সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নতুন করে বিক্ষোভ ঘিরে দেশটির প্রধান শহরগুলোতে উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *