ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে ভয়াবহ পাহাড়ধসের শঙ্কা, ঝুঁকিতে নগরের ২৬ পাহাড়

ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে ভয়াবহ পাহাড়ধসের শঙ্কা, ঝুঁকিতে নগরের ২৬ পাহাড়

গত কয়েকদিন ধরে চলা অবিরাম অতি ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টিপাতে আবারও ভূমিধসের আশঙ্কায় চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে বসবাসকারী হাজারো পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

গত দুই দিন আগে ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজারে ভূমিধসে অন্তত নয়জন নিহত হওয়ার পর এ আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার (৮ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত এই বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, অতীতে ভয়াবহ ভূমিধস, একাধিক উচ্ছেদ অভিযান, আদালতের নির্দেশনা এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের নানা আশ্বাস সত্ত্বেও নগরের ২৬টি চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনও ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে নগরের বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসেরও আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, আকবরশাহ, কুসুমবাগ, বায়েজিদ বোস্তামী, রৌফাবাদ, ফয়’স লেক ও খুলশী এলাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন প্রস্তুতি জোরদার করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে জেলা প্রশাসনের প্রস্তুত রাখা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় (১ নম্বর ঝিল সংলগ্ন) অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১ নম্বর ঝিল এলাকার প্রায় ১১০ জন বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছেন। ওয়াইডব্লিউসিএ কমিউনিটি স্কুলে আজ দুপুর পর্যন্ত ৪০ জন আশ্রয় নিয়েছেন, রাতে এ সংখ্যা প্রায় ১০০ জনে পৌঁছাতে পারে। ইলমুল কোরআন মাদ্রাসায় ৫০ জন এবং আল হেরা মাদ্রাসায় ১৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। আবহাওয়ার অবনতি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরের কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

এদিকে গত দুই দিনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মোট ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার রহমাননগর আবাসিক এলাকার বি ব্লকে দেওয়াল ধসে শফিকুর রহমান (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়াও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় পাহাড়ধসে রেনু আক্তার (৫৬) নামে আরও এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুইজন আহত হয়েছেন।

এর আগে সোমবার দিবাগত রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভারী বর্ষণের কারণে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ নয়জন নিহত হন।

নগরের বাইরে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড ও লোহাগাড়া, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি উপজেলাতেও ভয়াবহ পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ি এলাকাগুলোতে অব্যাহত বৃষ্টিপাতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে পড়ায় পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালু এলাকায় বসবাসকারী হাজারো মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক জরুরি সতর্কবার্তায় বলা হয়, অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। তাই পাহাড়ের পাদদেশ, পাহাড় সংলগ্ন ঢালু এলাকা এবং জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থানে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর, সোনাইছড়ি, কুমিরা, বাঁশবাড়ীয়া, বারৈয়াঢালা, বাড়বকুণ্ড ও মুরাদপুরসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বহু পরিবার পাহাড়ের ঢাল ও খাঁজে বসবাস করছে। এসব পরিবারের অধিকাংশই দিনমজুর, রিকশাচালক ও স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। অতীতের পাহাড়ধসের মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি এখনও স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং, সচেতনতামূলক প্রচার এবং আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতের কার্যক্রম দেখা গেলেও এবার শুরুতে তেমন দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল না। তবে প্রশাসনের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরসহ কয়েকটি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসন কাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পাহাড়ি এলাকাগুলোও বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে চুনতি, পুটিবিলা ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়। প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল বা পাদদেশে বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ বিন-আখন্দ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের মাইকিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন হলে ইউনিয়নভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হবে। আপাতত প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি না করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।

এদিকে বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান বলেন, পাহাড় ধ্বসের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। পাহাড়ধসের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ ল্যান্ডস্লাইড ডেটাবেজ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ভূমিধসে ২৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের জুনে, যখন কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভূমিধসে ১২৮ জন প্রাণ হারান।

“লিভিং উইথ আ ক্যাটাস্ট্রফি অ্যাট দ্য কস্ট অব লাইফ: ইলিগ্যাল অ্যান্ড রিস্কি সেটেলমেন্ট অন দ্য হিল স্লোপ ইন চট্টগ্রাম সিটি” শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত– এসবই ভূমিধসের প্রধান কারণ।

গবেষকদের মতে, কর্মস্থলের কাছাকাছি অবস্থান, কম ভাড়া এবং সহজে বাসস্থান পাওয়ার সুযোগ থাকায় নিম্নআয়ের মানুষ এসব পাহাড়ে বসতি গড়ে তুলছেন। তাদের বেশিরভাগই রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, দিনমজুর, গৃহকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আলক পাল বলেন, বাংলাদেশের পাহাড়ের মাটি নরম ও আলগা হওয়ায় এগুলো পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য পাহাড় কাটাও ঢালকে অস্থিতিশীল করে তোলে, আর দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি ভূমিধসের প্রধান উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।

নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বড় বড় ভূমিধসের ঘটনার পর দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও অপরিকল্পিত বসতি, পাহাড় কাটা এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন ও স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে প্রতি বর্ষায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ কেবল সাময়িক সমাধান হয়েই থাকবে।

এদিকে গত তিন দিন ধরে নগরে অতি ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা এবং দুর্যোগকালীন জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে ১০১ সদস্যের র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

এ কমিটিতে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিনকে আহ্বায়ক এবং চট্টগ্রাম সিটি রেড ক্রিসেন্টের সেক্রেটারি গোলাম বাকি মাসুদকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় আমরা একটি সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল গঠন করেছি। যেকোনো দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে এই র‍্যাপিড রেসপন্স টিম তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে কাজ করবে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসের আশঙ্কার মধ্যে চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আগে জীবন, তারপর অন্য সবকিছু। কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ফিরে যাবেন না।

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *