রাবাতের পর সিয়াটল, ফুটবলে আরেকবার ‘নির্মমতার শিকার’ সেনেগাল

রাবাতের পর সিয়াটল, ফুটবলে আরেকবার ‘নির্মমতার শিকার’ সেনেগাল

রাবাত আর সিয়াটল যেন এক বিন্দুতে এসে মিলল! গত ১৮ জানুয়ারি আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের ফাইনালে স্টপেজ টাইমে ১৫ মিনিটের জন্য মাঠের বাইরে থেকে রেফারির একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় সেনেগাল। পাপে থিয়াওর নেতৃত্বে খেলোয়াড়রা সেদিন ১৫ মিনিট মাঠের বাইরে ছিলেন।

পরে খেলোয়াড়রা মাঠে ফিরলে খেলা শুরু হয়। ফাইনালে সেনেগালের মাঠ ছাড়ার মূল কারণ ছিল মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে রেফরির দেওয়া পেনাল্টির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। এর ঠিক আগে সেনেগালের একটি গোল বাতিল হওয়ায় ও আয়োজক মরক্কো বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে—এমন অভিযোগে সেনেগালের কোচ দল নিয়ে মাঠ থেকে সাময়িকভাবে ওয়াক-অফ করেছিলেন। পরে অবশ্য ব্রাহিম দিয়াজের পানেনকা ঠেকিয়ে দেন সেনেগাল গোলকিপার এদুয়ার্দ মেন্দি। সেনেগাল অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র গোলে ম্যাচটি জেতে। কিন্তু মাঠ ছাড়ার শাস্তি হিসেবে তাদের কাছ থেকে শিরোপা কেড়ে নিয়ে দেওয়া হয়েছে মরক্কোকে, যদিও বিষয়টি ক্রীড়া আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

এবার বিশ্বকাপেও রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাশুল গুনল সেনেগাল। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ৮৬ মিনিট পর্যন্ত দুই গোলে এগিয়ে ছিল তারা। তারপর তিন মিনিটের ব্যবধানে লুকাকু ও টিয়েলম্যানসের গোলে সমতা ফেরায় ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষ। অতিরিক্ত সময়ে যখন সমতায় থেকে খেলা শেষ হওয়ার পথে, তখন ভিএআরে এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আসে।

বেলজিয়ামের টিয়েলসম্যান সেনেগালের ডিবক্সের মধ্যে একটি ক্রস নিয়ন্ত্রণে নিতে যান। কিন্তু সেনেগালের লামিনে কামারার চ্যালেঞ্জে মাটিতে পড়ে যান। রেফারি সাইদ মার্টিনেজ সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। বেলজিয়ামের পেনাল্টির আবেদনও উপেক্ষা করেন।

‘আধুনিক ফুটবলে এটাই সমস্যা। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা এখন বোঝে, বক্সের মধ্যে হালকা ছোঁয়া লাগুক, তারা পড়ে যাবে এবং ভিএআরের পুরস্কারের জন্য অপেক্ষা করবে।’
কিন্তু বেলজিয়ামের পক্ষে সম্ভাব্য পেনাল্টি কিকের জন্য ভিএআর অনফিল্ড রিভিউয়ের সুপারিশ করে। বল না খেলেই বেলজিয়ামের মিডফিল্ডারকে কামারা লাথি মেরেছিলেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেয় ভিএআর। পরে পিচসাইড মনিটরে রিপ্লে দেখতে বলেন রেফারিকে। পিচসাইড স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় ওই মুহূর্তের রিপ্লে দেখার পর রেফারি একে ফাউল হিসেবে সম্মতি দেন এবং পেনাল্টি দেন। পুরো রিভিউ প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে সাত মিনিট। ১২৫তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে টিয়েলম্যানস বেলজিয়ামকে জয় এনে দেন।

রেফারির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থিয়াও কোনো মন্তব্য করতে চাননি, ‘আমি রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এটা কষ্টের। কিন্তু আমাদের সেই দলকে অভিনন্দন জানাতে হবে, যারা সবকিছু দিয়েছে। আমরা ২-০ গোলের লিড ভালোভাবে সামলাতে পারিনি। প্রত্যেকে পেনাল্টি নিয়ে মন্তব্য করতে পারে, কিন্তু আমি চাই না এনিয়ে কথা বলতে। আমাদের শারীরিক সমস্যা ছিল, বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় আর পারছিল না, আমাদের পরিবর্তন করতে হয়েছে। এটা আমাদের মেনে নিতে হবে, ফুটবল এমনই।’

থিয়াও চুপ থাকলেও অনেক সাবেক তারকা এনিয়ে মন্তব্য করেছেন। সাবেক সুইডিশ তারকা জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ বলেছেন, আফ্রিকান দেশটি ‘ডাকাতির’ শিকার। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ফক্স স্পোর্টস-কে বলেন, ‘আমি মনে করি না বেলজিয়ামের জন্য এটা পেনাল্টি ছিল। সেনেগালকে ডাকাতি করা হয়েছে। স্পর্শ ছিল সামান্য। বেলজিয়ান খেলোয়াড়রা এর ফায়দা লুটেছে এবং রেফারিও সেটাই মনে করেছে।’

তিনি বলে গেলেন, ‘আধুনিক ফুটবলে এটাই সমস্যা। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা এখন বোঝে, বক্সের মধ্যে হালকা ছোঁয়া লাগুক, তারা পড়ে যাবে এবং ভিএআরের পুরস্কারের জন্য অপেক্ষা করবে।’

‘কারা খেলছে, তারও পর ভিত্তি করে যেন খেলার নিয়ম বদলে যায়। যদি এটা অন্য কোনো দল করত, তাহলে পেনাল্টি হতো না। আজ একটা নিয়ম, কাল আরেকটা নতুন নিয়ম। তাদের উচিত একটা নিয়মে অটল থাকা এবং খেলাটাকে ন্যায্য করা।’
ওবি মিকেল
পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও যাচাই করা উচিত মনে করেন ইব্রাহিমোভিচ, ‘পেনাল্টি আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত এবং সেটা আবশ্যিক। বিষয়টা সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। এটা এমন কোনো সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়, যা মানুষকে বোঝানোর জন্য ১০টি রিপ্লে, তিনটি ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল এবং পাঁচ মিনিটের বিতর্কের প্রয়োজন হয়। একটি সামান্য পেনাল্টির কারণে এত বড় একটি নকআউট ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে দেখাটা বেদনাদায়ক।’

সেনেগালের পক্ষ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যদি সেনেগালে হতাম, তাহলে গুরুতর প্রশ্ন তুলতাম। এটা রীতি হয়ে গেছে। প্রথমে মরক্কোর বিপক্ষে আফকন ফাইনালে, এখন আরেকটি বড় টুর্নামেন্ট, আরেকটি বড় ম্যাচে, আরেকটি শেষ দিকের পেনাল্টি সিদ্ধান্ত তাদের বিপক্ষে গেল।’

কানাডিয়ান ধারাভাষ্যকার ক্রেইগ ফরেস্ট বলেন, ‘আমি মনে করি এটা সেনেগালের ওপর নেওয়া খুব কঠিন সিদ্ধান্ত। এখানেই শুধু নয়, আফ্রিকান নেশনস কাপেও তাদের বিরুদ্ধে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।’

নাইজেরিয়ার সাবেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জন ওবি মিকেল বলেছেন, ‘কারা খেলছে, তারও পর ভিত্তি করে যেন খেলার নিয়ম বদলে যায়। যদি এটা অন্য কোনো দল করত, তাহলে পেনাল্টি হতো না। আজ একটা নিয়ম, কাল আরেকটা নতুন নিয়ম। তাদের উচিত একটা নিয়মে অটল থাকা এবং খেলাটাকে ন্যায্য করা।’

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *