সংকটের ১০ বছর: বছর আসে, বছর যায়—রোহিঙ্গারা যায় না

সংকটের ১০ বছর: বছর আসে, বছর যায়—রোহিঙ্গারা যায় না

নিজস্ব প্রতিবেদক

রোহিঙ্গা সংকটের এক দশকে পা দিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও সহিংসতার মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর কেটে গেছে নয় বছর। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সেই সংকট দশম বছরে পড়েছে। কিন্তু এখনো একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। সরকারের পরিবর্তন হলেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের মূল অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই স্থায়ী সমাধান।

তবে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। ফলে প্রতিবছর ২৫ আগস্ট এলেই নতুন করে সামনে আসে একই প্রশ্ন—কবে ফিরবে রোহিঙ্গারা?

তালিকা যাচাইয়ে ধীরগতি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে আছে তাদের পরিচয় যাচাই। চলতি মাসে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি।

মিয়ানমারের দাবি, ৪ হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে মিয়ানমার বলেছে, দেশটিতে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই। ঢাকা অবশ্য মিয়ানমারের এ অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিয়ানমারের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যানের অনেক কিছুই সঠিক নয়। জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধিত তথ্যেই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যার প্রতিফলন রয়েছে।

ঢাকা বলছে, যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

‘১০ থেকে ২০ বছর হতে দেওয়া যাবে না’

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেছেন, এই সংকটকে ১০ বছর থেকে ২০ বছরে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।

তার ভাষায়, বাংলাদেশ মানবিক সহায়তা ও আশ্রয় দিতে পারে; কিন্তু যে সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি, সেটির একক সমাধান বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।

যাচাই প্রক্রিয়াই কি বিলম্বের হাতিয়ার?

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির পেছনে রাজনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তাগত কারণ রয়েছে। শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।

তার মতে, প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘায়িত হবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করার কথা থাকলেও বাস্তবে এটি কালক্ষেপণ ও বিলম্বের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব বঙ্গোপসাগর, আসিয়ান এবং বৃহত্তর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও পড়ছে। তাই সংকটটিকে একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মানবনিরাপত্তা সংকট হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

একের পর এক উদ্যোগ, ফেরেনি কেউ

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসের মধ্যেই সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর আগে থেকেই কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছিল। বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে সম্মত হয় মিয়ানমার। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও হয়।

পরবর্তীতে রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের জন্য ২০১৯ সালে দুই দফায় উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমারে ফিরে গেলে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে কি না—এ নিয়ে আস্থা না থাকায় রোহিঙ্গারা ফেরার বিষয়ে সম্মতি দেয়নি। ফলে দুই দফার উদ্যোগই ব্যর্থ হয়।

এরপর বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি শুরু হলে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগের বাইরে চলে যায়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েক দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা হলেও তা সফল হয়নি। এর মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত তীব্র হওয়ায় রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ফলে এক দশকের দ্বারপ্রান্তে এসেও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। বছর আসে, বছর যায়—কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফেরার অপেক্ষা শেষ হয় না। বাংলাদেশের জন্য মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *