সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনে নতুন প্রস্তাব, সদস্য হতে পারে ১০৫ জন
নিজস্ব প্রতিবেদক
সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে নতুন প্রস্তাব উঠেছে। প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের অর্ধেক সদস্য সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে এবং বাকি অর্ধেক সংসদীয় আসনের অনুপাতে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাবও এসেছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সাড়ে ছয় ঘণ্টার বৈঠকে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষক প্রস্তাবটি দেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্য এতে সমর্থন জানান।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাব অনুযায়ী উচ্চকক্ষের সদস্যসংখ্যা হতে পারে ১০৫। এর মধ্যে ৫০ জন সংসদীয় আসনের অনুপাতে এবং ৫০ জন নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নির্বাচিত হবেন। বাকি পাঁচজনকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেবেন। প্রস্তাবকদের মতে, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া আরেক শিক্ষাবিদ প্রস্তাবটিকে গ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। এ জন্য সংবিধানে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির কথাও বলেন তিনি। প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের স্পিকার পদাধিকার বলে ভাইস প্রেসিডেন্ট হবেন। সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য উপদেষ্টাদের মনোনয়ন দেওয়া যেতে পারে।
ওই শিক্ষাবিদ সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাবও দেন। তাঁর যুক্তি, এতে সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও অন্তত একটি নির্বাচিত সংসদ বহাল থাকবে।
উচ্চকক্ষ নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের অবস্থান
সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আগে থেকেই ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সংসদীয় আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির কাঠামো, প্রক্রিয়া ও কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সরকার ও বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাবও এসেছে।
তিনি বলেন, স্পিকার ছাড়া অন্য উপদেষ্টারা সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে নিয়োগ পেতে পারেন—এমন বিধান রাখার বিষয়ে অনেকে মত দিয়েছেন। প্রস্তাবটি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা শেষ হয়নি। আরও প্রস্তাব পাওয়ার পর সেগুলো কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময় থাকায় কমিটির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিচার বিভাগ ও সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার নিয়েও আলোচনা
বৈঠকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের বিচারিক পর্যালোচনা এবং সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়ন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও মতামত দেন আলোচকেরা।
এ ছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, আস্থা ভোট ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এ বিষয়ে বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য হয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি।
সরকার, দল ও সংসদ—এই তিন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে একজন ব্যক্তির দায়িত্ব পালন করা উচিত কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, কেউ কেউ তিনটির পরিবর্তে দুটি পদে একই ব্যক্তির থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এ ছাড়া সংসদীয় কমিটিতে কাউকে তলব করার ক্ষেত্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সংসদীয় কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের সদস্যদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
উল্লেখ্য, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে গত ১৩ জুলাই সংসদে ১৭ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকার ও জোটসঙ্গীদের মধ্য থেকে ১২ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হলেও বিরোধী দল থেকে পাঁচ সদস্যের নাম চাওয়া হয়েছিল। তবে বিরোধী দল এ কমিটিতে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
