হরমুজে টানটান উত্তেজনা, যুদ্ধ নাকি আলোচনা?

হরমুজে টানটান উত্তেজনা, যুদ্ধ নাকি আলোচনা?

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতেও অবরোধ বজায় রেখেই আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তবে এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি ইরান।

এদিকে ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের প্রথম দিন কেটেছে পাল্টাপাল্টি দাবি ও সন্দেহের মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কঠোর নজরদারির কারণে ওই পথ দিয়ে কোনো জাহাজই চলাচল করতে পারেনি।

যদিও অনুসন্ধানী তথ্যে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। স্যাটেলাইট ডাটা অনুযায়ী, অবরোধের মধ্যেই অন্তত চারটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

এই পরিস্থিতিকে মার্কিন অবরোধের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের তেল রপ্তানিতে দেওয়া ছাড় আর বাড়াবেনা তারা।

এদিকে ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধের কঠোর সমালোচনা করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চলমান প্রেক্ষাপটকে ‘জঙ্গলের আইন’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি।

অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা ইতিবাচক বার্তা হয়ে এসেছে ইসরায়েল-লেবাননের আলোচনা।

দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে আলোচনার টেবিলে দেশ দুটি। ওয়াশিংটনে আয়োজিত বৈঠকে দুই দেশই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।

শীর্ষ পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল ও লেবানন। যে সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে বর্ণনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

একদিকে লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তের উত্তেজনা কমার ক্ষীণ আশা, অন্যদিকে ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ ও তেলের নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এক নাটকীয় মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি ‘ঐতিহাসিক’ বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ সরাসরি আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে। এই বৈঠককে ‘অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত জানান, এই আলোচনা প্রমাণ করে যে তিনটি দেশই এখন ‘একই পক্ষে’ অবস্থান করছে। অন্যদিকে, লেবাননের রাষ্ট্রদূত আলোচনাটিকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

এদিকে গত সপ্তাহে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আগামী দুই দিনের মধ্যে বড় কিছু ঘটতে পারে। আমরা আবারও পাকিস্তানে আলোচনায় বসতে আগ্রহী।’

তবে ইরান এই বিষয়ে এখনও সরাসরি কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান হলেও পুনরায় আলোচনায় বসার ব্যাপারে তাদের কাছে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের বরাতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এখনো কোনো তারিখ নির্ধারণ না হলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের নেতারা এই সপ্তাহের শেষের দিকে আবারও আলোচনা শুরু করতে পারেন।

ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নৌ-অবরোধের প্রথম ২৪ ঘণ্টা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম দাবি করেছে, অবরোধ চলাকালীন কোনো জাহাজ ইরান থেকে বের হতে বা প্রবেশ করতে পারেনি। তাদের নির্দেশে ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ পুনরায় ইরানি বন্দরে ফিরে গেছে।

তবে বিবিসি ভেরিফাই এর শিপ ট্র্যাকিং তথ্য বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। তথ্য অনুযায়ী, অবরোধ শুরুর পর অন্তত চারটি ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক গার্ডনারের মতে, প্রস্তুতির অভাব এবং ট্রান্সপন্ডার ইন্টারফেয়ারেন্স বা সংকেত বিভ্রাট এর কারণে অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে যে, তারা ইরানি তেলের ওপর সাময়িক শিথিল করা নিষেধাজ্ঞাগুলো আর নবায়ন করবে না।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা আবারো পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর হবে।

এদিকে, ইরানে মার্কিন অবরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই অবরোধকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সাথে সাক্ষাৎ শেষে জিনপিং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিশ্ব এখন আন্তর্জাতিক আইনের পরিবর্তে শক্তির দাপট বা ‘জঙ্গলের আইন’ এর দিকে ফিরে যাচ্ছে।

তিনি আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক শৃঙ্খলা রক্ষার আহ্বান জানান।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধকে তাদের সার্বভৌমত্বের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ রয়েছে।

শুরু থেকে ইরান অবরোধ করে রাখলেও জলপথটি বন্ধ করে ইরানের আয়ের উৎসে চাপ সৃষ্টি করতে এখন অবরোধ দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও।

এক ডজনেরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় দশ হাজার মার্কিন সামরিক কর্মী এখন ইরানের বন্দরে প্রবেশকারী বা বন্দর ত্যাগকারী যেকোনো দেশের জাহাজের ওপর অবরোধ কার্যকর করছে, যা ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংযোগ থেকে বঞ্চিত করছে।

সূত্র: বিবিসি

BD Short News 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *