মানিকগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘুস নেওয়ার ছবি ফাঁস

মানিকগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘুস নেওয়ার ছবি ফাঁস

মানিকগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুস গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি ঘুস ছাড়া কোনো ফাইলে সই করেন না বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের।

ঘুস গ্রহণের ফাঁস হওয়া ছবিটি ঢাকা জেলার হেমায়েতপুর এলাকার একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের। যেখানে বসে তিনি টাকার বান্ডিল গুনছেন। এমন একাধিক ছবি যুগান্তরের হাতে এসেছে। ছবি ফাঁস হতেই পৌরসভাজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোড়ন— চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে ঠিকাদারি মহল থেকে প্রশাসনিক অঙ্গন পর্যন্ত।

যুগান্তরের হাতে আসা ছবিতে দেখা যায়— খাবার টেবিলের উপর রাখা মোটা টাকার বান্ডিল খুলে নির্বাহী প্রকৌশলী নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে গুনে গুনে নিচ্ছেন। উপস্থিত সূত্র নিশ্চিত করেছে, টাকাগুলো ছিল কাজ পাইয়ের দেওয়ার দরদামের টাকা, যার পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত অক্টোবরের ২৯ তারিখ বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকার প্রান্ত চাইনিজ রেস্টুরেন্টের দোতলায় এ ঘুসের টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, রাজবাড়ীর এক ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকার লেনদেন হয়েছে।

ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর— চতুর নির্বাহী প্রকৌশলী নিজের অপকর্ম আড়াল করতে সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌর প্রশাসকের (স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক-ডিডিএলজি) বিরুদ্ধে বানোয়াট বেনামি অভিযোগ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন, যাতে নিজের অপকর্ম ও ঘুস কেলেঙ্কারির গতি অন্যদিকে ঘোরানো যায়।

সূত্রমতে, মানিকগঞ্জের তিনটি প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান— অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ ও কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স (জেভি), জনি ট্রেডার্স, রাফি অ্যান্ড রিকা (জেভি)—নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে— ১২ কোটি ২৬ লাখ টাকার প্রকল্পে কার্যাদেশ ইস্যু না করেই কাজ শুরুর অনুমতি ও কাজটি পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করে দেওয়ার সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে নেন ১৫ লাখ টাকা ঘুস।

সূত্রমতে, কার্যাদেশ ছাড়া কাজ শুরু করা সম্পূর্ণ বেআইনি, তবু বিষয়টি পৌর প্রশাসককেও অবহিত করা হয়নি। বিল আটকে রেখে ঘুস আদায়, ভয়ভীতি দেখানো ও অশোভন আচরণ তার পুরনো কৌশল— এমন অভিযোগও উঠে এসেছে। একাধিক ঠিকাদার ও দফতর সূত্র বলছে— নির্বাহী প্রকৌশলীর একচ্ছত্র আধিপত্যে জিম্মি হয়ে পড়েছে পুরো পৌরসভা।

সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্র জানায়, IUGIP/MANI/UT+DR/04/2023 প্যাকেজের কাজটি গোপন ও চুপিসারে চালানো হয়। এমনকি প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ— পৌর প্রশাসকও জানতেন না।

অভিযোগে বলা হয়— নিয়ম অনুযায়ী সকল প্রকল্পই প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে চালানোর কথা; কিন্তু কার্যাদেশ ছাড়া নিজে উপস্থিত থেকে প্রকৌশলী কাজ শুরু করান। এটি শুধু শিষ্টাচারবহির্ভূত নয়— প্রকল্প ব্যবস্থাপনা আইনেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পরে এলাকাবাসীর বাধা ও প্রশ্নে প্রকৌশলী পিছু হটেন।

এদিকে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পৌর প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে দাবি করেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাৎ ঘুস ছাড়া কোনো ফাইল সই করেন না এবং কাজ সঠিক হলেও নানা অজুহাতে হয়রানি করেন। তারা তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তবে অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাৎ হোসেন। তিনি যুগান্তরের প্রতিবেদককে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ছবিগুলো পুরোটাই ভুয়া। তিনি উল্টো অভিযোগ করেন, ‘লাভলু কন্ট্রাক্টর (জনি ট্রেডার্স) করাইছে। কাজের কোয়ালিটির জন্য চাপ দেওয়াতে এটা সাজাইছে। তবে ছবির প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন ঘুসের টাকা লেনদেন নয়, এটা আমার শালির (বউয়ের ছোট বোন) বাড়ি করার জন্য ইট কেনার পেমেন্ট দেওয়ার দৃশ্য। ঠিকাদার লাভলু আমাকে হয়রানি করার জন্য এটা করেছে।

ফাঁস হওয়া ছবিসহ লিখিত অভিযোগ হাতে পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আতিকুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, ঘুসের টাকা লেনদেনের ঘটনা অনুসন্ধান চলছে।

BD Short News 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *