মুরগির খাঁচার মতো কক্ষ, বছরের পর বছর আলোহীন বন্দিশালা
রাজধানীর উত্তরায় র্যাবের টিএফআই সেলে একেকটি কক্ষ যেন ছিল একেকটি নিরেট অন্ধকূপ। স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানো কিংবা শোয়ার সুযোগ নেই, কোনো কোনো কক্ষের উচ্চতা মাত্র ৪১ থেকে ৫৩ ইঞ্চি— যাকে প্রত্যক্ষদর্শীরা ‘মুরগির খাঁচার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আলো-বাতাসহীন এমন ভয়াবহ বন্দিশালায় আটকে রাখা হতো মানুষকে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর পরিদর্শনে বেরিয়ে এসেছে উত্তরার এই গোপন বন্দিশালার এমনই অমানবিক চিত্র।
গুমের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে আজ শনিবার (১ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে র্যাব-১ সদর দপ্তরে অবস্থিত ওই স্থাপনা পরিদর্শন করেন ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারক, প্রসিকিউশন টিম ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
পরিদর্শনকারী দলের নেতৃত্ব দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার। তার সঙ্গে ছিলেন ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ছাড়াও প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, সহিদুল ইসলাম সরদার ও তাসমিরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও পরিদর্শনে অংশ নেন।
পরিদর্শনকালে দেখা যায়, স্থাপনাটির কিছু কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে পুরোপুরি দাঁড়ানো বা স্বাভাবিকভাবে শোয়ার সুযোগ নেই। কোথাও বসলে উঠে দাঁড়ানোও কঠিন। এসব কক্ষকে মুরগির খাঁচার মতো বলে বর্ণনা করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, একটি কক্ষের উচ্চতা মাঝখান থেকে মাপলে ৪১ ইঞ্চি এবং আরেকটির উচ্চতা ৫৩ ইঞ্চি। এসব কক্ষের ভেতরেই বন্দিদের প্রস্রাব-পায়খানার জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিল।
পরিদর্শনের সময় আরও দেখা যায়, কয়েকটি কক্ষের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। ফলে বর্তমানে জায়গাগুলো তুলনামূলক বড় মনে হলেও আগে সেখানে ছোট ছোট কক্ষ ও পার্টিশন ছিল বলে জানানো হয়। একটি বড় জায়গার মধ্যেও ছয়-সাতটি ছোট কক্ষ ছিল। এসব কক্ষে একজন মানুষ হয়তো দাঁড়াতে পারতেন, তবে স্বাভাবিকভাবে শোয়ার সুযোগ ছিল না। হাঁটু ভাঁজ করে শুতে হতো।
কক্ষগুলোতে কোনো জানালা ছিল না। সামান্য পরিমাণ বাতাস ঢোকারও সুযোগ ছিল না। দিনের বেলাতেও ভেতরে ভয়াবহ অন্ধকার থাকত। কক্ষগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভেতরের কোনো শব্দ বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকে।
এসব কক্ষে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর মানুষকে আটকে রাখা হতো। পাশের কক্ষে কে আছেন বা তার সঙ্গে কী ঘটছে, তা জানারও সুযোগ ছিল না বন্দিদের। ছোট ছোট এসব কক্ষেই তাদের আটকে রেখে শাস্তি দেয়া হতো।
জানা যায়, ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এসব স্থাপনা বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী, আবার কখনো জঙ্গি সন্দেহে মানুষকে এখানে আটক করে রাখা হতো।
টিএফআই সেলটি প্রথমে গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে এটি র্যাব ইন্টেলিজেন্সের নিয়ন্ত্রণে আসে। র্যাবের সাধারণ সদস্যদের অনেকেরই এই ভবনের আশপাশে আসা কিংবা ভেতরের বিষয়ে জানার সুযোগ ছিল না।
গুম কমিশনের অনুসন্ধানের সময় এসব জায়গা প্রথমদিকে ব্লক করা ছিল বলে জানানো হয়। পরে তদন্ত দলের সহযোগিতায় জায়গাগুলো চিহ্নিত করে দেয়াল ভেঙে কক্ষগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়।
পরিদর্শনে আসা গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এসব কক্ষ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা গুমের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবি জানান। একই সঙ্গে গুম হওয়া ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেয়ার দাবিও তোলেন তারা।
মূলত গুমের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই এই পরিদর্শনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
এর আগে গত ২১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ টিএফআই সেল পরিদর্শনের অনুমতি দেয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, টিএফআই সেলকে কেন্দ্র করে গুমের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জন অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে তারা র্যাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এম খুরশীদ হোসেন, মো. হারুন অর রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম। তাদের বিরুদ্ধে মামলায় পলাতক থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
