হারিকেনের আলোয় ১১ সন্তানকে পড়িয়ে গড়ে তুলেছেন চেমন আরা
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
একসময় ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে উঠত হারিকেন। সেই মিটমিটে আলোয় চাটাইয়ে বসে পড়ত ১১ সন্তান। পাশে মাটির চুলায় রান্না, আর রান্নার ফাঁকে সন্তানদের পড়াশোনায় নজর—এভাবেই কেটে গেছে দিনের পর দিন।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার নাইখাইন গ্রামের গৃহবধূ চেমন আরা বেগমের বয়স এখন ৭৯ বছর। সীমিত আয়ের সংসারে ১১ সন্তানকে বড় করেছেন তিনি। তাঁর আট ছেলে ও তিন মেয়েই উচ্চশিক্ষিত হয়ে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের কেউ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক, কেউ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, কেউ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ। আবার কেউ চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা।
এই ১১ সন্তানের একজন অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। সম্প্রতি তিনি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, গ্রিন হাইড্রোজেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার জন্যও তিনি পরিচিত।
সন্তানদের ভাষ্য, তাঁদের এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান মায়ের। অভাব-অনটন, সংসারের নানা চাপ কিংবা নিজের চাওয়া-পাওয়া—কোনো কিছুই সন্তানদের পড়াশোনার পথে বাধা হতে দেননি চেমন আরা। বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। শিখিয়েছেন শিক্ষা, সততা, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের মূল্য।
হারিকেনের আলোয় সন্তানদের পড়াশোনা করানোর সেই দিনগুলো আজ অতীত। কিন্তু সেই মায়ের ত্যাগের আলোতেই আলোকিত হয়েছে তাঁর ১১ সন্তানের জীবন। প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।
সন্তানদের সাফল্যের পাশাপাশি চেমন আরা বেগম নিজেও পেয়েছেন স্বীকৃতি। ২০২৪ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা এবং জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন তিনি। এ ছাড়া ‘রত্নগর্ভা মা’ ও জাতীয় পর্যায়ের রত্নগর্ভা সম্মাননাসহ পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার।
একজন মায়ের স্বপ্ন, ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রম যে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, চেমন আরা বেগম তার উজ্জ্বল উদাহরণ। হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় যে ১১টি জীবন গড়ে উঠেছিল, আজ সেই সন্তানদের সাফল্যই যেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
