অনিরাপদ হাতিরঝিল: সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক, অন্ধকার–মশা–নষ্ট সিসি ক্যামেরায় দর্শনার্থীশূন্য
রাজধানীর বুকে নীল জলরেখা আর আলোঝলমলে সড়কের যে হাতিরঝিল একসময় ছিল পরিবার ও বিনোদনের নিরাপদ আশ্রয়, আজ তা ক্রমেই আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে। পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব, অধিকাংশ সিসি ক্যামেরা অচল, সীমিত নিরাপত্তাকর্মী, অপরিষ্কার পানি ও ভয়াবহ মশার উপদ্রব—সব মিলিয়ে সন্ধ্যার পর হাতিরঝিল এখন এক অনিরাপদ ও ভীতিকর এলাকায় পরিণত হয়েছে।
সন্ধ্যার পরই ফাঁকা, বাড়ছে আতঙ্ক
সরেজমিনে পুরো হাতিরঝিল ঘুরে দেখা যায়, দিনের আলো থাকতে কিছু মানুষ থাকলেও সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঝিলপাড় ফাঁকা হতে শুরু করে। ল্যাম্পপোস্টগুলোর অধিকাংশই নষ্ট থাকায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। কোথাও কোথাও বাতি থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
এই অন্ধকারেই ছিনতাই, মাদক কেনাবেচা ও সন্দেহজনক লোকজনের আনাগোনা বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত দর্শনার্থীদের। ছুরি বা দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে প্রায়ই। ভোরে হাঁটতে আসা মানুষজনও নিরাপদ বোধ করেন না।
‘ভুতুরে’ হয়ে ওঠা হাতিরঝিল
দিনের বেলায় হাতিরঝিল ঢাকার এক টুকরো স্বস্তির জায়গা হলেও রাত নামলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। অন্ধকার, নির্জনতা আর ভাঙা বাতির কারণে অনেকের কাছেই হাতিরঝিল তখন ‘ভুতুরে’ এলাকা মনে হয়। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে পানিতে কিছু পড়ার শব্দ কিংবা মোটরসাইকেলের বিকট আওয়াজ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর পরিবেশ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কোনো জায়গা ভুতুরে হয়ে ওঠে মানুষের অনুপস্থিতিতে নয়, বরং আলো, নিরাপত্তা ও নজরদারির অভাবে। হাতিরঝিলও তার ব্যতিক্রম নয়।
নষ্ট সিসি ক্যামেরা, নির্ভীক অপরাধী
হাতিরঝিলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—বেশিরভাগ সিসি ক্যামেরা নষ্ট বা অচল। ফলে অপরাধ ঘটলেও তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সিসি ক্যামেরা কার্যকর না থাকায় অপরাধীরা আরও নির্ভীক হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে হাতিরঝিলের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পায় আনসার বাহিনী। বর্তমানে ১১৮ জন আনসার সদস্য তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানানো হলেও ৩০২ একর বিশাল প্রকল্পের তুলনায় এই সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল বলে মনে করছেন দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে মগবাজার ও এফডিসি সংলগ্ন এলাকায় আনসার সদস্যদের উপস্থিতি খুব কম দেখা যায়।
মশার উপদ্রব ও অপরিষ্কার পানি
নিরাপত্তার পাশাপাশি হাতিরঝিলে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ মশার উপদ্রব। সন্ধ্যা নামলেই মশার আক্রমণে বসে থাকা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর হয়ে পড়ে।
পরিবারসহ ঘুরতে আসা মাহফুজ উদ্দিন খান বলেন, ‘এত মশা যে এক মিনিটও বসা সম্ভব নয়। হাতিরঝিলে এসে যে সৌন্দর্য উপভোগ করব, সেটাই আর সম্ভব হয় না।’
এ ছাড়া ঝিলের পানিও অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। পানিতে ময়লা-আবর্জনা ভেসে থাকতে দেখা যায়, যা পুরো পরিবেশকে আরও অনাকর্ষণীয় করে তুলছে।
একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাতিরঝিল থেকে সাংবাদিক, নারী ও যুবকসহ একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এলাকাটির নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি হাতিরঝিলে দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার সাংবাদিক হাবীব রহমানের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ফয়েজ ও রবিন নামে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার হয় ঝিল থেকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরদিন সকালে হাতিরঝিল এলাকা থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটে।
অনেক ঘটনায় আজও রহস্য উদঘাটন হয়নি।
সেনাবাহিনীর পর রাজউক, তারপর অব্যবস্থাপনা
১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা হাতিরঝিল প্রকল্প উদ্বোধন হয় ২০১৩ সালে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই প্রকল্প ২০২১ সালের জুনে রাজউকের কাছে হস্তান্তরের পর থেকেই অব্যবস্থাপনা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ দর্শনার্থীদের। তাদের ভাষ্য, তখন থেকেই নিরাপত্তা শিথিল, রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি স্পষ্ট।
এ দিকে ২০২৪ এর জুলাই থেকে হাতিরঝিলের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পায় আনসার বাহিনী। বর্তমানে ১১৮ জন আনসার সদস্য তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানানো হলেও বিশাল আয়তনের তুলনায় এই সংখ্যা অপ্রতুল বলে মনে করছেন অনেকেই। মধুবাগ, পুলিশ প্লাজা বা রামপুরার কিছু অংশে আনসার সদস্যদের দেখা গেলেও মগবাজার বা এফডিসি সংলগ্ন এলাকায় তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়—ঝিলের বিভিন্ন পয়েন্টে কার্যকর সিসি ক্যামেরার অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ ফলে অপরাধ ঘটলেও তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আনসার সদস্য দাবি করেন, “আগের তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। আমাদের তৎপরতার কারণে ছিনতাই কমেছে।” তবে বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
পুলিশের হিসাব আর বাস্তবতার ফাঁক
থানা-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারিতে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার, মার্চে বিপুল ইয়াবার চালান জব্দসহ একাধিক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে হাতিরঝিলে। স্থানীয়রা বলছেন, অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগই করেন না—ভোগান্তির আশঙ্কায়।
হাতিরঝিল থানার ওসি গোলাম মোর্তুজা বলেন, ‘২৪ ঘণ্টায় একাধিক টহল দল কাজ করছে। অন্য এলাকার তুলনায় এখানে অপরাধ কম।’
তবে নিয়মিত দর্শনার্থীদের ভাষ্যে সেই ‘নিরাপত্তা’ অনুভূত হয় না।
খানাখন্দে ভরা সড়ক, বাড়ছে দুর্ঘটনা
হাতিরঝিলের একমুখী সড়কের বিভিন্ন অংশ—তেজগাঁও, কুনিপাড়া, পুলিশ প্লাজা, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে গর্ত ঢেকে থাকায় হঠাৎ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সড়ক দ্রুত সংস্কার করা হবে, কাজ চলছে।’
অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে নান্দনিক স্থান
নগরবাসীর জন্য বিনোদনের বড় আয়োজন হিসেবে গড়ে তোলা হাতিরঝিল আজ অবহেলার শিকার।
এলাকাবাসী বলছেন, হাতিরঝিলের মতোই ঢাকার আরও অনেক নান্দনিক দর্শনীয় স্থান—যেমন জিয়া উদ্যানসহ বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র—জাঁকজমকপূর্ণভাবে তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সৌন্দর্য নয়, এখন নিরাপত্তাই বড় প্রশ্ন
নান্দনিক নকশা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য যে হাতিরঝিল ঢাকার গর্ব হওয়ার কথা ছিল, আজ তা নিরাপত্তাহীনতা, অন্ধকার, মশা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দর্শনার্থীশূন্য হয়ে পড়ছে।
রামপুরা মহানগর প্রজেক্টের বাসিন্দা আকবর হোসেন ৫ বছরের মেয়েকে নিয়ে ঝিলে ঘুরতে এসে বলেন, ‘আলো কম, নিরাপত্তা নেই। প্রায়ই শুনি ছিনতাই আর মাদক বেচাকেনার কথা। বাচ্চা নিয়ে আসতে ভয় লাগে।’
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শহরের কোনো জায়গা ভুতুরে হয়ে ওঠে মূলত মানুষের অনুপস্থিতিতে নয়, নিরাপত্তার অভাবে। হাতিরঝিলও তার ব্যতিক্রম নয়। আলো, নজরদারি আর নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে রাতের হাতিরঝিলও হতে পারে দিনের মতোই প্রাণবন্ত।
কার্যকর সিসি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, মশা নিয়ন্ত্রণ, পানির পরিচ্ছন্নতা, সমন্বিত পুলিশ-আনসার টহল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া হাতিরঝিলকে আবার নিরাপদ ও প্রাণবন্ত বিনোদন কেন্দ্রে ফেরানো সম্ভব নয়—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নগর বিশেষজ্ঞরা।
