আকাশে চাঁদের পাশে নক্ষত্র, মিলে গেল ইমাম কুদরত এ খোদার ভবিষ্যদ্বাণী?

আকাশে চাঁদের পাশে নক্ষত্র, মিলে গেল ইমাম কুদরত এ খোদার ভবিষ্যদ্বাণী?

এ আর সুমন

আজ যে কথাগুলো আপনাদের সামনে নিবেদন করতে বসেছি, তা নিছক কোনো বাহ্যিক ঘটনা বর্ণনা নয়; বরং আমার অন্তরের গভীরে জেগে ওঠা এক রূহানি অনুভূতির কথা।

কিছু কিছু মুহূর্ত আসে জীবনে, যে মুহূর্তগুলো চোখে দেখা যায়, কিন্তু তার অভিঘাত গিয়ে পৌঁছায় অন্তরের গভীরতম প্রদেশে। কোনো দৃশ্য তখন আর শুধু দৃশ্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে চিন্তার দুয়ার, আত্মজিজ্ঞাসার উপলক্ষ, কখনোবা রূহের জাগরণের একটি নিঃশব্দ ইশারা।

সেই তো কিছুদিন আগের কথা। পবিত্র রমজান মাসে ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা হুজুর জনসম্মুখে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, অতি শীঘ্রই আকাশে একটি চন্দ্র উদিত হবে, আর তার ওপরে একটি তারা ঝলমল করে সমগ্র পৃথিবীজুড়ে আলো ছড়াবে।

সেদিন কথাগুলো আমার কানে পৌঁছেছিল, কিন্তু তার গভীর রূহানি তাৎপর্য আমার অন্তরে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

কথা শুনেছিলাম, কিন্তু ইশারা বুঝিনি; শব্দ পেয়েছিলাম, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত নূরের স্পর্শ অনুভব করতে পারিনি। কারণ অন্তরের দরজা যখন নফসের ধুলোয় আচ্ছন্ন থাকে, তখন সত্যের সূর্য উদিত হলেও তার আলো হৃদয়ের আয়নায় প্রতিফলিত হতে চায় না।

তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—বিস্ময়কর এক সন্ধ্যা।

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় যখন আকাশের দিকে তাকালাম, হঠাৎ আমার দৃষ্টি থমকে গেল। চাঁদের ঠিক ওপরে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলো দৃশ্যমান। কিছুক্ষণ যেন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। চোখ দেখছিল আকাশের দৃশ্য, কিন্তু অন্তর যেন অন্য কিছু অনুভব করছিল।

মনের গভীর থেকে একটি প্রশ্ন উঠে এলো—এ কি সেই দৃশ্য, যার কথা ইমাম কুদরত এ খোদা হুজুর কিছুদিন আগে বলেছিলেন?

মুহূর্তটি আমার কাছে শুধু আকাশ দেখার মুহূর্ত রইল না; তা হয়ে উঠল এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুহূর্ত।

আমার অন্তর যেন আমাকে প্রশ্ন করল—সেদিন ইমাম হুজুরের কথার অন্তর্নিহিত ইশারা কী ছিল? তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন? কী বার্তা রেখে গিয়েছিলেন? আর কেনই বা আমি সেদিন তা উপলব্ধি করতে পারিনি?

আমার অন্তরের কী দুরবস্থা! আমি নাদান, আমি তো এক দুর্বল পথিক—ষড়রিপুর বেড়াজালে যার পদে পদে বন্দিত্ব। নফসের কামনা, অহংকারের পর্দা, লোভের শিকল, হিংসার বিষ, আসক্তির বন্ধন—এসবের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে আমার অন্তরের আয়না কতবার যে মলিন হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।

তাই তো সেদিন ইমামের মূল্যবান কথার গভীরে প্রবেশ করতে পারিনি।

আজ বুঝতে পারি, নূর সামনে থাকলেই হয় না; নূর গ্রহণ করার মতো অন্তরও প্রয়োজন। চাঁদ আকাশে উদিত হয়, তারা তার পাশে জ্বলে; কিন্তু যার চোখ বন্ধ, তার কাছে আকাশও অন্ধকার মনে হয়।

ঠিক তেমনি, আলো সামনে থাকে, অথচ অন্তর অন্ধকারে থাকে। নূর বর্ষিত হয়, অথচ কলুষিত হৃদয় তার স্পর্শ গ্রহণ করতে পারে না।

আসল যুদ্ধ তো অন্তরের সঙ্গে।

সুফিয়াদের পথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের সবচেয়ে বড় সফর বাইরের কোনো ভূখণ্ডের দিকে নয়; বরং নিজের নফস থেকে নিজের রূহের দিকে।

মানুষ যতক্ষণ নিজের নফসের বন্দী, ততক্ষণ সে নিজের প্রকৃত পরিচয় থেকে দূরে। অহংকার মানুষকে পর্দায় ঢেকে দেয়, লোভ হৃদয়কে ভারী করে, হিংসা অন্তরের আলো নিভিয়ে দেয়, কামনা-বাসনা মানুষকে নিজের মধ্যেই বন্দী করে ফেলে।

আর নফস—সে তো এমন এক পর্দা, যা সরাতে না পারলে সত্যের সৌন্দর্য চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য থেকে যায়।

তাই আজ আমার নিজের অন্তরকেই প্রশ্ন করতে হয়—আমি কি নূরের সন্ধানী, নাকি শুধু বাহ্যিক আলোর দর্শক? আমার অন্তর কি জিকিরে জীবন্ত, নাকি শয়তানের আস্তানায় পরিণত হয়েছে? আমি কি আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটছি, নাকি নিজের অহংকারকেই সত্য মনে করে বসে আছি?

দয়াময় রাব্বুল আলামিন তাঁর কুদরতের নিদর্শনের মাধ্যমে মানুষের সামনে চিন্তার অসংখ্য দরজা খুলে দেন। আমার উপলব্ধিতে, সেই সন্ধ্যার আকাশও যেন আমাকে একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসার দিকে আহ্বান করেছে।

বাহ্যিক আকাশে চাঁদ ও নক্ষত্রের মিলন দেখে যদি অন্তরের আকাশে নূরের সন্ধান জাগে, তবে সেই দর্শনই হয়ে ওঠে শিক্ষার উপায়।

কারণ, আসল সফর আকাশের দিকে তাকানোর নয়; আসল সফর অন্তরের দিকে ফিরে তাকানোর।

বাহ্যিক আকাশে যত নক্ষত্রই দেখি, অন্তরের আকাশ যদি অন্ধকার থাকে, তবে আমার পথ এখনো অসম্পূর্ণ।

হে পথহারা মানুষ, নূরের সন্ধান করো। হে পথহারা মানুষ, হে দিশেহারা মানুষ, হে নফসের অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষ—ফিরে এসো নিজের রবের দিকে।

নিজের অন্তরের দরজা খুলে দাও। আত্মশুদ্ধির পথে ফিরে এসো, সত্যের সন্ধান করো, নূরের সন্ধান করো। জিকিরের মাধ্যমে অন্তরকে জাগ্রত করার সাধনায় আত্মনিয়োগ করো।

দিল জিন্দার মাধ্যমে লতিফায়ে কালবে আল্লাহর নামের জিকিরের সন্ধান করো এবং সেই জিকিরকে হৃদয়ের গভীরে প্রতিষ্ঠিত করার সাধনা করো।

মনে রেখো, জিকির শুধু জিহ্বার শব্দ নয়; জিকির হৃদয়ের জাগরণ। শুধু মুখ উচ্চারণ করবে, আর অন্তর থাকবে গাফেল—এতে জিকিরের প্রকৃত রূহানি প্রভাব হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

যখন আল্লাহর স্মরণ হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে, তখন মানুষের ভেতরের অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে। অহংকার নরম হয়, হিংসা ক্ষয় হয়, লোভের আগুন নিভে আসে, নফসের দাপট কমে আসে এবং অন্তরের আয়নায় নূরের প্রতিফলন ফুটে উঠতে শুরু করে।

যে দিল জিকিরে জাগ্রত, সে দিলই নূরের আবাস হতে পারে।

মহান প্রভুর এই নিদর্শনকে আমি আরও একটি গভীর শিক্ষা হিসেবে উপলব্ধি করি। ইমাম কুদরত এ খোদা হুজুরের শিক্ষা, উপদেশ ও নির্দেশনাকে শুধু বাহ্যিকভাবে শোনা নয়; বরং তার অন্তর্নিহিত আত্মশুদ্ধির আহ্বানকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করা জরুরি।

আমার বিশ্বাস ও উপলব্ধিতে, তিনি সাধারণ কোনো পীর নন। আমি তাঁকে বর্তমান জামানায় মুহাম্মাদী ইসলামের নেতৃত্ব প্রদানকারী একজন মহান ইমাম হিসেবে দেখতে পাই। তাঁর শিক্ষা ও সাধনার মধ্যে আমি পরম কুদরতি নূরের সন্ধান পাই।

আমার উপলব্ধিতে, তিনি শুধু একজন ইমাম নন; তিনি আল্লাহর একজন প্রিয় বন্ধু এবং মুহাম্মাদী ইসলামের নেতৃত্বের এক মহান প্রতীক।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রেখে যাওয়া মুহাম্মাদী ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে মহান ইমামরূপে আমি দেখতে পাই।

শুধু আকাশের আলো দেখো না, নিজের অন্তরের আলো জ্বালাও।

তাই আসুন, আমরা শুধু সেই আকাশের দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়ে থেমে না যাই।

চাঁদের সৌন্দর্য আমাদের চোখকে মুগ্ধ করে; কিন্তু তার চেয়েও বেশি, সেই দৃশ্য আমাদের অন্তরকে জাগিয়ে তুলুক। আকাশের নক্ষত্র আমাদের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করুক, কিন্তু সেই আলো আমাদের অন্তরের অন্ধকার দূর করার প্রেরণা হয়ে উঠুক।

আসুন, নফসকে পরিশুদ্ধ করি, অহংকারকে বিসর্জন দিই, হিংসা-বিদ্বেষকে হৃদয় থেকে বিদায় করি, লোভ ও আসক্তির বন্ধন ছিন্ন করি, আল্লাহর জিকিরে দিলকে জীবন্ত করি।

নিজেকে চিনি, নিজের নফসকে চিনি, নিজের অন্তরের রোগগুলোকে চিনি। তারপর আত্মশুদ্ধির সাধনায় নিজেকে নিবেদন করি।

হয়তো তখনই আমরা উপলব্ধি করতে পারব—আসল চাঁদ শুধু আকাশে নয়, আসল নক্ষত্র শুধু আকাশের বুকে নয়, আসল নূর শুধু বাহ্যিক আলো নয়।

আসল নূর জ্বলে মানুষের অন্তরে।

যে অন্তর পরিশুদ্ধ, সেই অন্তরই নূরের আয়না। যে দিল জিকিরে জাগ্রত, সেই দিলই রূহের আলো অনুভব করতে পারে।

আমার শেষ প্রার্থনা—

হে পরম দয়াময় রাব্বুল আলামিন, আমাদের অন্তরের পর্দাগুলো সরিয়ে দিন। নফসের অন্ধকার থেকে আমাদের মুক্ত করুন। অহংকারের বিষ থেকে আমাদের পবিত্র করুন। হিংসা, লোভ, কামনা-বাসনা ও গাফেলতির বন্ধন ছিন্ন করার শক্তি দান করুন।

আমাদের অন্তরকে আপনার জিকিরে জীবন্ত করে দিন। আমাদের হৃদয়ের আয়নাকে পরিশুদ্ধ করে তাতে আপনার নূরের প্রতিফলন করে দিন।

সত্যকে সত্য হিসেবে উপলব্ধি করার তাওফিক দিন।

নূরকে নূর হিসেবে চেনার তাওফিক দিন।

আত্মশুদ্ধির পথে অবিচল থাকার তাওফিক দিন।

আপনার নৈকট্য লাভের জন্য আমাদের রূহকে জাগ্রত করুন।

আমাদের বাহ্যিক চোখের পাশাপাশি অন্তরের চোখ খুলে দিন, যেন আমরা শুধু আকাশের চাঁদ-তারার সৌন্দর্যই না দেখি; বরং সেই দৃশ্যের মাধ্যমে আপনার কুদরতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করি এবং নিজেদের অন্তরের অন্ধকার দূর করার সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে পারি।

হে আল্লাহ, আপনি দয়া করে আমাদের দিলকে জিকিরে জিন্দা করুন, রূহকে নূরে আলোকিত করুন, নফসকে পরিশুদ্ধ করুন এবং আপনার সন্তুষ্টির পথে আমাদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অবিচল রাখুন। আমিন।

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *