এক নজরে ট্রাম্প শাসনের প্রথম বছর, বিশ্বব্যবস্থাকে ঝাঁকুনি দিয়েছে যেসব ঘটনা

এক নজরে ট্রাম্প শাসনের প্রথম বছর, বিশ্বব্যবস্থাকে ঝাঁকুনি দিয়েছে যেসব ঘটনা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই তিনি বিশ্বকে এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন। গত বছর ওয়াশিংটনের তীব্র শীতের মধ্যে শপথ গ্রহণ শেষে ট্রাম্প বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “আমাদের পথে কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।” বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিস ডৌসেট তার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতি ও বিশ্বরাজনীতির ওপর এর প্রভাব তুলে ধরেছেন।

গ্রিনল্যান্ড ও নতুন ‘ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’

ট্রাম্প তার ভাষণে ১৯ শতকের ‘ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ বা ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার’-এর ধারণাটি ফিরিয়ে এনেছেন। যার মূল কথা হলো—আমেরিকান আদর্শ ছড়িয়ে দিতে মহাদেশজুড়ে ভূখণ্ড বিস্তার করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঐশ্বরিকভাবে নির্ধারিত। একসময় তার নজর ছিল পানামা খালের ওপর, যা তিনি “পুনরুদ্ধারের” ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর এখন তার সেই সংকল্পের লক্ষ্যবস্তু ডেনমার্কের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। এ বিষয়ে তার নতুন মন্ত্র হলো—”এটা আমাদের পেতেই হবে।”

লিস ডৌসেট উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্য দেশের শাসক বা সরকার পরিবর্তনের ঘটনা অনেক থাকলেও, গত এক শতাব্দীতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিনের মিত্র দেশের জমি দখলের এবং তাদের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শাসন করার হুমকি দেননি। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থা ও জোটগুলোর জন্য বড় হুমকি।

বিশ্বনেতাদের উদ্বেগ ও ‘নিয়মহীন বিশ্ব’

ট্রাম্পের এই নীতিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দাভোস ইকোনমিক ফোরামে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সতর্ক করে বলেছেন, “আমরা এমন এক বিশ্বের দিকে যাচ্ছি যেখানে কোনো নিয়ম নেই, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন পদদলিত হচ্ছে এবং সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যার শক্তি বেশি, তারই আইন চলছে।”

ন্যাটোর অস্তিত্ব নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড জোর করে দখলের চেষ্টা করেন, তবে ৭৬ বছরের পুরনো এই সামরিক জোট ভেঙে পড়তে পারে। এমনকি কংগ্রেস সদস্য র‍্যান্ডি ফাইন এরই মধ্যে ‘গ্রিনল্যান্ড সংযুক্তি ও রাষ্ট্রত্ব আইন’ নামে একটি বিলও উত্থাপন করেছেন।

মাফিয়া স্টাইল ও রিয়েল এস্টেট কূটনীতি

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের এডিটর-ইন-চিফ জ্যানি মিন্টন বেডোজ ট্রাম্পের এই আচরণকে “মাফিয়া স্টাইল ক্ষমতা” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “ট্রাম্প জোট বা আমেরিকার তাত্ত্বিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী নন। তিনি লেনদেন ও পাশবিক শক্তিতে বিশ্বাসী।”

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, ট্রাম্প একজন “রিয়েল এস্টেট মোগল”-এর মতো আচরণ করছেন, যিনি গ্রিনল্যান্ড দখল নয় বরং কিনতে চান। তবে ট্রাম্প নিজেই নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “ন্যাটোকে রাশিয়া বা চীন মোটেও ভয় পায় না। কিন্তু আমাদের (আমেরিকাকে) তারা প্রচণ্ড ভয় পায়।”

‘ডনরো ডকট্রিন’ ও নোবেল না পাওয়ার ক্ষোভ

ভেনিজুয়েলায় আগ্রাসনের পর ১৯ শতকের ‘মনরো ডকট্রিন’-এর আদলে ট্রাম্পের নীতিকে এখন ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলা হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন, আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় তিনি যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন।

সম্প্রতি নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি লিখেছেন, “আমি আর শুধু শান্তির কথা ভাবার দায় অনুভব করি না… এখন আমি শুধু আমেরিকার জন্য যা ভালো ও সঠিক, তা নিয়েই ভাবব।”

মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও স্যান-ওয়াশিং

বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্পের নীতিকে যৌক্তিক হিসেবে দেখানোর যে প্রচেষ্টা চলছে, এডওয়ার্ড লুস তাকে ‘স্যান-ওয়াশিং’ (পাগলাটে আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন) বলে অভিহিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির জন্য ট্রাম্পের চাপকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ইস্যুতে তার দ্বিমুখী আচরণ এবং সামরিক হামলার প্রশংসা নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন

ট্রাম্প এখন রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে বিশ্বনেতাদের পাঠানো ব্যক্তিগত বার্তা বা মেসেজ প্রকাশ্যে এনে দিচ্ছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ কিংবা ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটের পাঠানো তোষামোদপূর্ণ বার্তাগুলো প্রকাশ করে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, সনাতন কূটনীতির দিন শেষ। লিস ডৌসেট তার বিশ্লেষণে উপসংহারে বলেন, ট্রাম্পের এই “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি এবং মিত্রদের প্রতি অবজ্ঞা বিশ্বরাজনীতির ভারসাম্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সূত্র : বিবিসি

BD Short News 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *