কুবি ছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, স্বামী পুলিশ হেফাজতে
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ভাড়া বাসা থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী নাজমুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ফারজানার পরিবারের অভিযোগ, যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি। নারী নির্যাতনের মামলা প্রত্যাহারের পর তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি পরিবারের সদস্যদের। তবে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এটি আত্মহত্যা হতে পারে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অপেক্ষা করছে পুলিশ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকা পোস্টকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুব আলম।
ওসি জানান, স্বামীর সঙ্গে অভিমান করে এক নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের কক্ষ থেকে একটি চিরকুটও পেয়েছে। তবে চিরকুটে কী লেখা ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি তিনি।
এর আগে শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে ফারজানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ফারজানা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর স্বামী নাজমুল ইসলাম একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর আগে নাজমুল ইসলামের সঙ্গে ফারজানার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। একপর্যায়ে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন আরও বেড়ে যায়।
ফারজানার ভাই আরিফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে তাঁর বোনের পরিবারের কাছ থেকে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা নিয়েছেন নাজমুল। শুরুতে নাজমুল বেকার থাকলেও চাকরি পাওয়ার পর তাঁর টাকার চাহিদা আরও বেড়ে যায়। অর্থের জন্য চাপ দেওয়ার পাশাপাশি ফারজানার ওপর নির্যাতনও চলতে থাকে।
পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে গত বছরের ডিসেম্বরে স্বামীর বাসা ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন ফারজানা। এ ঘটনায় স্বামীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মামলা করার পর নাজমুলের পরিবারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে নির্যাতন না করার আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে পারিবারিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলে মামলা প্রত্যাহারের বিষয়েও আলোচনা হয়।
আরিফুল ইসলাম জানান, ঘটনার আগের দিন বিকেলে নাজমুলের দুলাভাই তাঁকে ফোন করে মামলা প্রত্যাহার হয়েছে কি না, তা জানতে চান। জবাবে তিনি জানান, মামলা প্রত্যাহার হয়ে গেছে এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্রও পাওয়া গেছে বলে তিনি জানেন।
ফারজানার পরিবারের অভিযোগ, মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো পাওয়া যায়নি।
আরিফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে বোনের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। তখন ফারজানার কথাবার্তায় অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। রাতে খাওয়ার জন্য তিনি চিপস ও কোমল পানীয়ও কিনেছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই তাঁর মৃত্যুর খবর পান তাঁরা। রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ফোন করে বোনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে এমন ঘটনা ঘটায় তাঁদের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ফারজানার পরিবারের দাবি, বিয়ের পর থেকে নির্যাতন, অর্থের জন্য চাপ এবং মামলা প্রত্যাহারের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
ফতুল্লা থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) গাজী সুমন মাহতাব বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে ফারজানাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তাঁর স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
