গভীর সংকটে জাতিসংঘ, উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার সুযোগ বাংলাদেশের

গভীর সংকটে জাতিসংঘ, উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার সুযোগ বাংলাদেশের

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, জ্বালানি ও জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি, সংস্কার এবং নতুন মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে জাতিসংঘ। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সংস্থাটির সংকট উত্তরণে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আজ ২৪ অক্টোবর, জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে সংস্থাটি। ৫১টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতিসংঘের বর্তমান সদস্যসংখ্যা ১৯৩।

জাতিসংঘের সংকটকালে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গত ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৯৯ ভোট পেয়ে তিনি এ পদে নির্বাচিত হন। গত সেপ্টেম্বরে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও রয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। সংস্থাটির স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা। ইউনেস্কোর ৪০তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন সংস্থাটিতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি খন্দকার এম তালহা। এ ছাড়া জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আইরিন খান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘ বর্তমানে একটি সংকটময় সময় পার করছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির সংকট উত্তরণে সফল ভূমিকা রাখতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবদান আরও দৃশ্যমান হবে।

ওই কর্মকর্তা জানান, সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে জাতিসংঘের সংকট নিরসন এবং বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। এ বছর জাতিসংঘের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির ‘ইউএন-৮০’ সংস্কার উদ্যোগের আওতায় প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলো মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।

মহাসচিব নির্বাচনেও অনিশ্চয়তা

জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে সমর্থন ও ঐকমত্যের প্রশ্নে জটিলতা রয়েছে।

এবার আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মহাসচিব নির্বাচনের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে বিভিন্ন অঞ্চলের প্রার্থীদের নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের অবস্থান নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের প্রত্যেকেরই মহাসচিব নির্বাচনে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে প্রার্থীদের সমর্থন আদায় এবং ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা নতুন মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাজেট সংকট ও বিশ্বজুড়ে সংঘাত

জাতিসংঘের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বাজেট সংকট। সংস্থাটির অর্থায়ন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে চাপ বাড়ছে। ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘের অন্যতম বৃহৎ অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্রও ব্যয় কমানোর বিষয়ে চাপ দিচ্ছে। এতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও সংকট মোকাবিলায় সংস্থাটির সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, গাজায় ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ, ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং ইয়েমেনে লড়াই বিশ্বশান্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের মতো বিষয়েও আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন।

এমন বাস্তবতায় জাতিসংঘের সংস্কার, কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন এ প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতা এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের দীর্ঘ সম্পৃক্ততা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের তিন বছরের মাথায় ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। এরপর থেকে বহুপাক্ষিক কূটনীতি, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে দেশটি।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী দেশ। এ ছাড়া সংস্থাটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ রয়েছে।

১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। চার দশক পর আবারও বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধির সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরছে।

তবে যুদ্ধ বন্ধ, অর্থায়ন নিশ্চিত করা, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার মতো জটিল বিষয়গুলোতে জাতিসংঘের কার্যকারিতা কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। এ প্রেক্ষাপটে সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

rumaakter144e@gmail.com

Related articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *