গাজী নজরুলের এমপি পদের কী হবে?
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্পিকারকে জানিয়ে মরিয়মের বাবার করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
পরে আদালত আজ দুপুরে তাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠান।
এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত এই সংসদ সদস্যের পদ থাকবে কি না, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণে সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে—এমন সরাসরি বিধান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে নেই।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদে আসন শূন্য হওয়ার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।
ওই অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, কোনো দল থেকে মনোনীত কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর ওই দল থেকে পদত্যাগ বা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে দল থেকে বহিষ্কার হলে আসন শূন্য বা সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কথা উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না—সে বিষয়ে বলা হয়েছে। এর একাংশে উল্লেখ আছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তিলাভের পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে ওই ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারাবেন।
সোমবার নির্বাচন ভবনের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেছে, ‘সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে এখনো সংসদ থেকে কোনো চিঠি আসেনি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু আইন অনুযায়ী সংসদ থেকে কোনো চিঠি না এলে আমাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
চিঠি পেলে গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে গাজী নজরুলকে বহিষ্কার আদেশে ‘নৈতিক স্খলন’-এর তথ্য জানিয়েছিল জামায়াত।
দলের বহিষ্কারাদেশে বলা হয়েছিল, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ৬৬(২)-এর কোনো অযোগ্যতায় পড়েছেন কি না বা ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার আসন শূন্য হয়েছে কি না—এ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে নিষ্পত্তির জন্য পাঠানোর বিধান রয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্তই এ বিষয়ে চূড়ান্ত।
আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দলীয় বহিষ্কার বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই। তবে ফৌজদারি মামলায় তিনি যদি এমনভাবে দণ্ডিত হন, যাতে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও প্রাসঙ্গিক আইনের অধীনে তিনি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েন, তখন বিষয়টি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।
মরিয়মের মৃতদেহ উদ্ধার
রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গতকাল রবিবার রাতে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) জি এম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
ঘটনাস্থল থেকে এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই রাতেই এমপি নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী এবং এক স্বজনকে আসামি করে মামলা করেছেন মরিয়মের বাবা। পরে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মামলার এজাহারে যে অভিযোগ
এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, গত জুন মাসে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে তার বড় মেয়ে মরিয়মের (১৯) বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তার পরিবারকে বলে গেছেন।
এর মধ্যে রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল কল করে বাদী মাসুম বিল্লাহকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি মরিয়মকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন। মামলার এজাহারে তিনি লিখেছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় মেয়ের বিছানার ওপরে তার লেখা ‘সুইসাইড নোট’ দেখতে পান তিনি।
একাধিক নোটে যা লেখা
মামলার এজাহারে উল্লেখিত নোটগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে লেখা ছিল। দাবি করা হচ্ছে, এগুলো মরিয়ম খাতুনের লেখা।
এর মধ্যে একটি চিরকুটে লেখা আছে, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।’
আরেকটি চিরকুটে লেখা, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি, হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমি তো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’
আরেকটি চিরকুটে লেখা, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!’
অপর একটিতে লেখা, ‘কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়…ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’
রিমান্ডে এমপি নজরুল ও তার স্ত্রী
মরিয়ম আক্তারের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের একদিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত।
আজ দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন।
এই মামলা আরেক আসামি মৃত মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান। এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তারের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে আলোচনায় আসেন নজরুল
গত ২০ জুলাই সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে সঙ্গে থাকা নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন গাজী নজরুল। পরবর্তীতে ওই নারীর পরিচয় প্রকাশ হয়, যার নাম মরিয়ম খাতুন। গতকাল রবিবার রাতে তার মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
