জনপ্রিয় তরুণ লেখক সাদাত হোসেনের দুঃখগাথা
জনপ্রিয় তরুণ লেখক সাদাত হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগময় স্ট্যাটাস দিয়েছেন। স্ট্যাটাসে তিনি দেশের চলমান সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন এবং মানবতার বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরেছেন।
স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
আমি দুর্বল চিত্তের মানুষ! ছোটবেলায় আমার দাদী আমাকে মুরগির কলিজা খেতে দিতেন না, তার ধারণা ছিল মুরগির কলিজা খেলে আমার কলিজা হয়ে যাবে মুরগির কলিজার সমান ছোট। বড় হয়ে আমি হবো ভীতু! অল্পতেই আমার কলিজা কেঁপে উঠবে। ভয়ে, আতঙ্কে আমি জড়সড় হয়ে থাকব। আমার দাদীর চেষ্টা সম্ভবত কাজে লাগে নি, আমি যত বড় হয়েছি, তত ভীতু হয়েছি। অল্পতেই আমার কলিজা থরথর করে কাঁপে। আমি পত্রিকায় বীভৎস ছবি দেখতে পারি না, নাটকে সিনেমায় খুন খারাবি দেখতে পারি না, প্রবল আতঙ্কে আমার বুক ধরফর করে! কলিজা শুকিয়ে আসে। গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়েও আমার বুক শীতল হয় না।
আমার এই বুক ধরফর কাটানোর ব্যবস্থা করল আমার এক বন্ধু, সে বলল, ‘আরে গাধা, যখন সিনেমায় নৃশংস কোনো দৃশ্য দেখবি, তখন মনে মনে ভাববি, আরে ধুর! এইগুলাতো বানানো ঘটনা, সাজানো পুরোটাই, এরা অভিনয় করছে, ওই বর্বরতা নৃশংসতা, চিৎকার, কান্না, বাঁচার আর্তনাদ ওসব কিছুই বাস্তব নয়, এগুলো জাস্ট শ্যুটিং! শ্যুটিং! সো, আতঙ্কিত হবার কিছু নাই।’
এই আইডিয়া আমার পছন্দ হলো, কার্যকরও হল। যখন টিভিতে, নাটকে, সিনেমায় ভয়ংকর কোন দৃশ্য দেখে আমি আঁতকে উঠি, তখন ওই ‘শ্যুটিং এবং অভিনয়’ ভাবনা থিওরি অবলম্বন করি, আমার প্রবল আতংক তাতে কমে!
সেবার টিভিতে খবর দেখছিলাম, বিশ্বজিৎ নামের এক ছেলেকে ছুরি, চাপাতি, রামদা হাতে রাস্তায় ছাত্রলীগের কতগুলো ছেলে ধাওয়া করছে। বিশ্বজিতের সারা শরীরজুড়ে রক্তের দাগ। ছেলেগুলো তাকে ইচ্ছেমত কোপাচ্ছে, চারপাশে দাঁড়িয়ে অজস্র মানুষ তা দেখছে! আমিও দেখছি, টিভি পর্দায়! আমার পাশে বসা ছোটচাচা বলল, ‘এরা কী মানুষ? এরা কী মানুষ?’
আমি নির্বিকার গলায় বললাম, ‘চাচা, এত ভয়ের কিছু নাই, এটা বাস্তব কোন দৃশ্য না, এটা অভিনয়, অভিনয়, শুটিং! তুমি দেখে বুঝতেছ না? চারপাশে এত এত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ কিছু বলতেছে না, বাস্তবে এমন ঘটে? ঘটে না! এটা নিশ্চয়ই শুটিং! কোন সিনেমার কে জানে?’
ছোটচাচা দীর্ঘক্ষণ আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন। তার ধারণা আমি পাগল-টাগল কিছু হয়ে গেছি! আমি যে পাগল হয়ে গেছি, এটা আজও বুঝলাম। প্রকাশ্য রাস্তায় যুবদলের এক কর্মী সে পাথর ছুঁড়ে থেতলে দিয়ে অবর্ণণীয় নির্মম উপায়ে একজন মানুষকে মেরে ফেলল!
সত্যি সত্যিই মেরে ফেলল?
এও কী সম্ভব? বাস্তবেই সম্ভব?
এ কী সেই প্রস্তর যুগের কোনো নৃশংস দৃশ্য?
এ কী সত্যি?
আমি জানি না। আমার মাথা কাজ করছে না। প্রবল আতঙ্কে হাত পা অসাঢ় হয়ে আসছে। রক্ত হিম হয়ে আসছে ভয়ে। সেই আতঙ্ক কাটাতে বারবার ভাবতে ইচ্ছে করছে, এ সত্যি নয়। কিছুতেই এ সত্যি নয়।
কোনো মানুষ কোনো মানুষকে এভাবে খুন করতে পারে না। কিছুতেই না। কিন্তু এসব ভেবেও আমার ভয় কাটে না। আমার সেই ছোট্ট ভীত সন্ত্রস্ত কলিজা শুকিয়ে আসে। আতঙ্কে জড়সড় হয়ে যায় হৃদয়। মনে হয় গলার কাছে জগদ্দল পাথরের মতো কিছু একটা আটকে আছে। তাতে প্রচন্ড ব্যথা হয়। আমি যেন ঢোক গিলতে পারি না। কাঁদতেও না।
আমি তাই অন্ধকারে চুপ করে বসে রইলাম। চোখ বন্ধ করে। আমার বুকের ভেতর কী যেন চলছে! আমি হঠাৎ টের পেলাম, কেউ একজন যেন বলছে, ‘জগতে মানুষের চেয়ে নৃশংস আর কেউ নেই, কিছু নেই, কিচ্ছু না’!
