পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ্ ভাইরাস: সংক্রমণ কি আদৌ ছড়িয়েছে?

পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ্ ভাইরাস: সংক্রমণ কি আদৌ ছড়িয়েছে?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ্ ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে—এমন আশঙ্কার মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত রাজ্যটিতে মাত্র দুজনের দেহে নিপাহ্ ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। আক্রান্ত দুজনই পেশায় নার্স—একজন নারী ও একজন পুরুষ।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানানো হয়েছে, এই দুজনের সংস্পর্শে আসা ১৯৬ জনকে চিহ্নিত করে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল। তবে পরীক্ষায় তাঁদের কারও দেহে নিপাহ্ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের সূত্র জানায়, আক্রান্ত পুরুষ নার্সের দ্বিতীয় দফা পরীক্ষার ফলও নেগেটিভ এসেছে। তাঁকে হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে নারী নার্সের অবস্থা এখনো সংকটজনক। তিনি লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। কলকাতার কাছের বারাসতের যে হাসপাতালে তাঁরা কর্মরত ছিলেন, সেখানেই দুজনের চিকিৎসা চলছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য

পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ্ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে—এমন খবর গত কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমের একাংশে প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, অনুমানভিত্তিক ও ভুল তথ্য সংবাদমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, এনসিডিসির তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে গত ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র দুজন নিপাহ্ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত স্বাস্থ্য প্রোটোকল অনুসরণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বিদেশি বিমানবন্দরগুলোতে সতর্কতা

নিপাহ্ সংক্রমণের খবরের প্রেক্ষিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে কয়েকটি দেশ। থাইল্যান্ড ও নেপাল কলকাতা থেকে যাওয়া বিমানযাত্রীদের বিশেষ স্ক্রিনিং করছে। থাইল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতের ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ থেকে আসা যাত্রীদের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কলকাতা থেকে থাইল্যান্ডের এসব বিমানবন্দরে সরাসরি ফ্লাইট চলাচল করে।

থাইল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি পার্মানেন্ট সেক্রেটারি ডা. সোফন এমাসিরিথাভর্ন বলেন, ভারতে নিপাহ্ পরিস্থিতি গত সপ্তাহ থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে যেকোনো সংক্রমণ মোকাবিলায় তারা প্রস্তুতি জোরদার করেছে।

আগে কোথায় সংক্রমণ হয়েছিল

পশ্চিমবঙ্গে এর আগে দুবার নিপাহ্ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা গেছে। ২০০১ সালে শিলিগুড়িতে সংক্রমণে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়। পরে ২০০৭ সালে নদীয়া জেলাতেও নিপাহ্ ছড়িয়েছিল।

ভারতের কেরালা রাজ্যে প্রায়ই নিপাহ্ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০২৩ সালে সেখানে যে সংক্রমণ ছড়ায়, সেটিকে ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল কেরালা সরকার।

বিশ্বে প্রথম নিপাহ্ ভাইরাস শনাক্ত হয় ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় একটি শূকর খামারে। ওই প্রাদুর্ভাবে একশর বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ১০ লাখ শূকর নিধন করা হয়।

বাংলাদেশে নিপাহ্ পরিস্থিতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, নিপাহ্ একটি জুনোটিক ভাইরাস—যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায় এবং পরে মানুষে মানুষে সংক্রমিত হতে পারে। বাংলাদেশে নিপাহ্ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০০১ সালে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয় ২০০৪ সালে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ৩০৩ জন নিপাহ্ আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা প্রায় ৭০ শতাংশ।

বাংলাদেশে গবেষণায় দেখা গেছে, বাদুড় খেজুরের রসের মাধ্যমে নিপাহ্ ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়। কাঁচা খেজুরের রস পান করলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।

সতর্কতা জরুরি

নিপাহ্ ভাইরাসের কোনো টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা এখনো নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেজুরের রস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, রস ঢেকে রাখা এবং প্রয়োজনে উত্তপ্ত করে নেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি ফল খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে ও খোসা ছাড়িয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

BD Short News 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *