মামলা হয়নি, জাহাজে বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকিতে তদন্তকারী দল

মামলা হয়নি, জাহাজে বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকিতে তদন্তকারী দল

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত হওয়ার চার দিন পরও তদন্তের মূল স্পটে ঢুকতে পারছে না তদন্তকারী দল। জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের তীব্র ঝুঁকি থাকায় বাইরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিশেষজ্ঞদের। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, গ্যাসের উৎস এবং জাহাজটি কাটার আগে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

দুর্ঘটনাস্থলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত রয়েছে জাহাজের ভেতরে। কিন্তু সেখানে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি থাকায় নিরাপত্তার কারণে কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। গ্যাস নিরাপদ মাত্রায় না আসা পর্যন্ত সরেজমিন তদন্তও সম্ভব নয়।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শাখা আট সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে। এতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং মেরিন সার্ভেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের আদেশে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসীর আরাফাত খান, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. শোয়েব আহমেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জহির উদ্দিন, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রকৌশলী ও শিপ সার্ভেয়ার মো. আরাফাত হোসেন এবং মেরিন সার্ভেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের রাখা হয়েছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পর প্রথমে পাঁচ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল দিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছিল। পরে জাহাজের বদ্ধ প্রকোষ্ঠে বিপজ্জনক রাসায়নিক ও বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতা বিবেচনায় আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাউকে জাহাজের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে মূল স্পটে প্রবেশ করা সম্ভব না হলেও পারিপার্শ্বিক তথ্য, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে তারা গিয়েছেন। কিন্তু জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতা এত বেশি যে সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে জাহাজটি আমদানির সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া নথিপত্র যাচাই করে জানা গেছে, ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় জাহাজটি নির্মাণ করা হয়। এর মূল নাম ছিল ‘এইচএস রাস লাফফান’। পরে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে ‘এমভি রাসি’ রাখা হয়।

নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত জাহাজভাঙা নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের ২৬ জুন হংকং কনভেনশন কার্যকর হয়। এ কনভেনশন অনুযায়ী, জাহাজ রপ্তানিকারককে আমদানিকারকের কাছে জাহাজের ক্ষতিকর উপাদানের তালিকা দিতে হয়। এমভি রাসির ওই তালিকা তৈরি করেছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেটিজফট এশিয়া পিটিই লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সরেজমিন পরিদর্শন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং জাহাজ সম্পর্কে জানেন এমন ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল।

তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে কিছু কোম্পানি এসব জাহাজের পতাকা পরিবর্তন করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এ ধরনের ক্রেতাদের ‘ক্যাশ বায়ার’ বলা হয়। তারা অনেক সময় জাহাজের ক্ষতিকর উপাদানসংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য না থাকা নথি জমা দেয়।

অন্যদিকে দুর্ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো মামলা হয়নি। সোমবার বিকেলে সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার সকালে দুর্ঘটনা ঘটলেও রোববার বিকেল পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।

ওসি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মামলা করার কথা থাকলেও তারা এখনো কেউ থানায় আসেনি। পুলিশ তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে।

এখন তদন্তকারী বিশেষজ্ঞ দলের মূল স্পটে প্রবেশের অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা। জাহাজের ভেতরের বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি দূর করে সরেজমিন তদন্ত সম্ভব হলেই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *