মুক্তিযোদ্ধার নাতি হয়েও কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিলেন জুলাইয়ের সমন্বয়ক ফয়সাল
শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাতি হওয়ায় সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা পাওয়ার সুযোগ ছিল মো. ফয়সাল মুরাদের। তবে ব্যক্তিগত সেই সুবিধা গ্রহণকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে না করে তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেন। পরবর্তীতে সেই আন্দোলনই জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন অন্যতম সমন্বয়ক ফয়সাল মুরাদ বলেন, দীর্ঘদিনের মুক্তিযোদ্ধা কোটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। তার মতে, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে, তবে তা শিক্ষা, আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত; চাকরিতে দীর্ঘমেয়াদি বড় আকারের কোটা নয়।
ফয়সালের ভাষ্য, তিনি মনে করতেন চাকরিতে কোটা থাকলেও তা সীমিত পরিসরে, সর্বোচ্চ ২.৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত। ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকেই তিনি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি জানান, কোটা আন্দোলন তার কাছে শুধু চাকরির দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং রাষ্ট্র সংস্কার এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশাও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। তার দাবি, আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি ধারণা করেছিলেন এটি একসময় বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেবে।
আন্দোলনের শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে ফয়সাল বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজেদের অর্থ সংগ্রহ করে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু করেন। পরে গুলিস্তানের জিরোপয়েন্ট, তাঁতীবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে মন্তব্য এবং পরদিন বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৬ জুলাই তার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ফেরদৌস গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও তাকে আন্দোলনে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করে।
ফয়সাল জানান, ১৭ জুলাই পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এসে পুলিশি অভিযান, ইন্টারনেট বন্ধ, গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং পরে গোয়েন্দা নজরদারির কারণে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। অনেক দিন ফ্যান-লাইট বন্ধ রেখে অন্ধকার ঘরে অবস্থান এবং সীমিত খাবার খেয়ে দিন পার করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তার দাবি, আন্দোলনের সময় বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সমন্বয়কদের আটক ও নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলন আরও গতি পায়।
৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, পুরান ঢাকার বিভিন্ন ব্যারিকেড এড়িয়ে তারা শহীদ মিনারের দিকে অগ্রসর হন। এ সময় চানখাঁরপুল এলাকায় শাহরিয়ার খান আনাস গুলিবিদ্ধ হন, যাকে তিনি আন্দোলনের আত্মত্যাগী যোদ্ধাদের একজন হিসেবে স্মরণ করেন।
জুলাই আন্দোলনের পর ফয়সাল ছাত্রদল ছেড়ে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরে জাতীয় ছাত্রশক্তির সঙ্গে যুক্ত হন। তার দাবি, ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, দেশের স্বার্থ এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তিনি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
