সালমান শাহ: ঢাকাই সিনেমার ‘টাইম ট্রাভেলার’
বাংলা চলচ্চিত্রে অনেক নায়ক এসেছেন, জনপ্রিয় হয়েছেন, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু কিছু তারকা আছেন, যাঁদের পর্দা থেকে বিদায় নেওয়ার পরও দর্শকের ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, তাঁদের জনপ্রিয়তা ততই নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে। সালমান শাহ তেমনই এক ক্ষণজন্মা তারকা।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্ম নেওয়া সালমান শাহ ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করেন। তবে বড় পর্দায় তার অভিষেক হয় ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। প্রথম সিনেমাতেই মৌসুমীর বিপরীতে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন তিনি।
এরপর খুব অল্প সময়েই ঢাকাই চলচ্চিত্রে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন সালমান শাহ। মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে অভিনয় করেন ২৭টি সিনেমায়। ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখি’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’ ও ‘আনন্দ অশ্রু’র মতো সিনেমা তাকে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে সালমান শাহর জনপ্রিয়তা শুধু অভিনয় কিংবা সিনেমার সাফল্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার পোশাক, চুলের স্টাইল, সানগ্লাস, ব্যান্ডানা, বাইক চালানোর ধরন—সবকিছুই সে সময়ের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা তৈরি করেছিল। নব্বইয়ের দশকের দর্শকের কাছে তার স্টাইল ছিল সময়ের তুলনায় বেশ আধুনিক। এ কারণেই তাকে অনেকেই ঢাকাই সিনেমার ‘টাইম ট্রাভেলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
পর্দায় তার উপস্থিতিতে ছিল এক ধরনের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে যেমন দর্শকের হৃদয় জয় করেছিলেন, তেমনি ভিন্নধর্মী চরিত্রেও নিজের অভিনয়ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। তার হাসি, পোশাক ও অভিনয়ের নিজস্ব ধরন তাকে সমসাময়িক নায়কদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
কিন্তু মাত্র ২৫ বছর বয়সেই থেমে যায় তার পথচলা। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও আইনি বিতর্ক রয়েছে। অকালমৃত্যুতে থেমে গেলেও সালমান শাহর জনপ্রিয়তা থেমে থাকেনি।
বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছেন এক আলাদা আবেগের নাম। তার সিনেমা, গান, পোশাক ও অভিনয়ের দৃশ্য এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচিত হয়।
সালমান শাহর পর চলচ্চিত্রে আসা অনেক নায়কই তাকে নিজেদের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও দর্শকের স্মৃতিতে তার উপস্থিতি এখনো উজ্জ্বল। মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ার, অথচ প্রভাব কয়েক প্রজন্মজুড়ে—এই বৈপরীত্যই হয়তো সালমান শাহকে বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য ‘টাইম ট্রাভেলার’ করে তুলেছে।
