আড়াই কোটির ঢাকায় দুই কোটি মানুষের নেই নিজস্ব আবাসন
রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক মানুষেরই নেই নিজস্ব আবাসন। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি হলে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ মানুষের নিজস্ব বাসস্থান রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষকে ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। তাদের আয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে বাসা ভাড়ায়। নিম্ন আয়ের মানুষের অনেকেই থাকছেন বস্তি কিংবা বসবাসের অনুপযোগী ছোট কক্ষে।
রাজধানীর এমন বাস্তবতার শিকার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের অসংখ্য মানুষ। তাদের একজন জাকির হোসেন। একসময় ঢাকায় নিজের একটি ফ্ল্যাট কিংবা শহরতলিতে একটি বাড়ির স্বপ্ন দেখলেও এখন আর সেই স্বপ্ন দেখেন না তিনি।
জাকির বলেন, ‘যা বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার মোটামুটি চলে। অতিরিক্ত কিছু করার মতো টাকা হাতে থাকে না। ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, অসুস্থ মায়ের ওষুধপত্র ও পরিবারের পেছনেই সব ব্যয় হয়ে যায়।’
জাকিরের মতো ঢাকার বহু কর্মজীবী মানুষের আয়-ব্যয়ের বড় অংশই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। নিম্ন আয়ের মানুষের সংকট আরও তীব্র। তাদের একটি অংশকে বস্তি, ফুটপাত কিংবা ছোট ও অস্বাস্থ্যকর কক্ষে বসবাস করতে হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য—‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকায় ভাড়া বাসায় বসবাসের বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও নিজস্ব আবাসন ও ভাড়াভিত্তিক আবাসনের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা অত্যন্ত প্রকট। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের নিজস্ব বাসস্থান নেই। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের পাশাপাশি বস্তিবাসীরাও এর মধ্যে রয়েছেন।
তিনি বলেন, এসব মানুষের পক্ষে নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা করা কঠিন। তাদের আয়ের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আবাসন খাতে ব্যয় হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চললেও কার্যকর আবাসন নীতির ঘাটতি সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
অন্যদিকে, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন সংকট সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের আবাসন ঋণ চালুর পাশাপাশি অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তার মতে, আবাসন খাতের কর ও ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে এনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
আবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও কর্মসংস্থানের কারণে প্রতিনিয়ত ঢাকামুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু বাড়ছে না সেই অনুপাতে সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ। ফলে অনেক মানুষকে বস্তি, ফুটপাত কিংবা বিভিন্ন পরিবহন টার্মিনাল এলাকায় রাত কাটাতে হচ্ছে।
সরকার অবশ্য সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে উচ্চ, মধ্যম ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভূমি উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, আবাসিক প্লট ও ফ্ল্যাট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গৃহহীনদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি স্বল্প ব্যয়ে টেকসই ঘর নির্মাণের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজও চলছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩ হাজার ৫১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৪টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনে ১৫টি ১৪ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, ময়মনসিংহে মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ এবং নোয়াখালীর মাইজদী ও হবিগঞ্জে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সহজ অর্থায়ন এবং কার্যকর নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত করা না গেলে ঢাকার আবাসন সংকট সহজে কাটবে না।
