এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত করবে অন্য বাহিনী
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে ওই ঘটনার তদন্ত করতে পারবে না। নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী অথবা বিশেষ আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের ওপর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬-এ এমন বিধান রাখা হয়েছে।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট ও অনুপস্থিতির মধ্যেই জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয়। আইনে গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণের পাশাপাশি অপরাধের শাস্তি, ভুক্তভোগী ও পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, কোনো অভিযোগের তদন্ত করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে তদন্তের দাবি বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অন্য বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করার বিধানটি সঠিক সিদ্ধান্ত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, নতুন আইন গুমের ঘটনায় বিচার পাওয়ার সুযোগ আরও বিস্তৃত করেছে। আইনে গুমের স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচারের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করে তাঁর অবস্থান গোপন করলে, অজ্ঞাত স্থানে রাখলে কিংবা আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করলে সেটি গুম হিসেবে গণ্য হবে। কোনো গুমের ঘটনা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এর বিচার হবে।
আইনের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে ওই বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না। কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে কিংবা সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা বিশেষ আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের ওপর তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে।
এ ছাড়া কোনো বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কমান্ডার বা দলনেতা অধস্তন সদস্যদের গুমের মতো অপরাধের নির্দেশ দিলে, প্ররোচনা দিলে কিংবা অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে তিনিও মূল অপরাধীর সমান শাস্তির মুখোমুখি হবেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালন বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাত আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না।
সাধারণ গুমের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে কিংবা পাঁচ বছর পরও জীবিত বা মৃত অবস্থায় তাঁর সন্ধান না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে।
সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করা কিংবা গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব অপরাধে সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।
আইনে মামলা দায়েরের পর সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে আরও ৩০ দিন সময় বাড়ানো যাবে। একইভাবে তদন্ত শেষ করার জন্য ৯০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পদ্ধতিগত বা ব্যাপকভাবে সংঘটিত গুমের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার করা হবে। সাধারণ আদালতে কোনো মামলা চলার সময় ঘটনাটি ব্যাপক বা পদ্ধতিগত অপরাধ হিসেবে প্রতীয়মান হলে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ থাকবে।
ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার রক্ষায়ও আইনে বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গুম হওয়া ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য আদালত থেকে ‘গুম সনদ’ নিয়ে তাঁর সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন স্বামী, স্ত্রী বা নির্ভরশীলরা। গুমের পাঁচ বছর পার হলে আইনগত ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য আদালত ঘোষণা দিতে পারবে।
এ ছাড়া দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি ক্রোক ও নিলামের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য সরকারি পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা তহবিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
গুমের ঘটনায় ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ, যেমন ভিডিও ও কল রেকর্ড, আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। তথ্য প্রকাশকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য বিদ্যমান আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গুম সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও ইউনিটের পরিচয় এবং তদন্তের অগ্রগতি সংরক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির বিধান রাখা হয়েছে।
আইনি বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গুম প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের অধিকার নিশ্চিত এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে নতুন আইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
