ঘর আছে, নেই বসবাসের পরিবেশ!
ভূমিহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে- এমন আশায় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়েছিলেন চাঁদপুরের মৈশাদী ইউনিয়নের হামানকদ্দীর পাখি বেগম। ঘর পাওয়ার পর স্বামী-সন্তান নিয়ে নতুন করে সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন বেশি দিন টেকেনি। ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়া, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়া, ঘরের সামনে পানি জমে থাকা আর সাপের উপদ্রবের সঙ্গে যোগ হয়েছে কাজের অভাব ও যোগাযোগের দুর্ভোগ। একপর্যায়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটিই তাঁর কাছে বসবাসের জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে।
পাখি বেগম বলেন, “ঘর পাওয়ার এক বছরের মধ্যেই ঘরের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। বৃষ্টি হলে চাল দিয়ে পানি পড়ে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে। ঘরের সামনে পানি জমে থাকে। সাপের উপদ্রবও আছে। এভাবে এখানে থাকা খুব কষ্টের।”
চাঁদপুরের বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাস্তব চিত্র এখন এমনই। ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য নির্মিত ঘর আছে, কিন্তু অনেক ঘরে মানুষ নেই। কোথাও ঘরে ঝুলছে তালা, কোথাও কমে গেছে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা। আবার কোথাও পরিবারগুলো ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেও সরকারি নথিতে সেই ঘর বরাদ্দ দেওয়া অবস্থাতেই রয়েছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু ঘর পেলেই জীবনযাপন সহজ হচ্ছে না। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা, বাজার ও প্রয়োজনীয় সেবা থেকে দূরত্ব, বিশুদ্ধ পানির সংকট, বিদ্যুতের সমস্যা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং কিছু ঘরের জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে তাঁরা আশ্রয়ণ প্রকল্পে টিকে থাকতে পারছেন না।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ১৭৩টি পরিবারের জন্য ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে সর্বশেষ ১১৫টি ঘরসহ বিভিন্ন পর্যায়ে এসব ঘর নির্মাণ ও বরাদ্দ দেওয়া হয়।
২০২১ সালে হামানকদ্দী আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৪০টি ঘর নির্মাণ করে ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ঘর পাওয়ার পর শুরুতে প্রায় সব পরিবারই সেখানে বসবাস শুরু করে। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই অনেক পরিবার প্রকল্প ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে সেখানে ১০ থেকে ১২টি পরিবার বসবাস করছে। বাকি ঘরগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ পড়ে আছে।
প্রকল্পের বাসিন্দা হোসনে আরা বলেন, “ঘর পেয়ে প্রথমে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু পরে দেখি দোকান-বাজার অনেক দূরে। কাজের সুযোগও কম। অসুস্থতাও লেগে থাকে। তাই অনেকে ঘরে তালা দিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।”
বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পের অবস্থান এমন জায়গায় হলে যেখানে আশপাশে নিয়মিত কাজ নেই, সেখানে ঘর পাওয়ার পরও তাঁদের অর্থনৈতিক সংকট কাটে না। কাজের জন্য দূরে যেতে হলে যাতায়াত খরচ বাড়ে। অনেক সময় কাজের মজুরির একটি অংশ যাতায়াতেই চলে যায়।
শুধু হামানকদ্দী নয়, সদর, হাইমচর ও মতলব উত্তরের চরাঞ্চলের বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়েও রয়েছে একই ধরনের অভিযোগ।
নদী ও চরাঞ্চলের প্রকল্পগুলোর যোগাযোগের সমস্যা তুলনামূলক বেশি। বর্ষায় নৌ পথের ওপর নির্ভর করতে হয়। শুকনো মৌসুমে কোথাও কাঁচা বা দুর্বল সড়কই প্রধান ভরসা। ফলে বাজার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা কর্মস্থলে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয় বাসিন্দাদের।
বিশুদ্ধ পানির সংকটও তাদের নিত্যদিনের সমস্যা। কোথাও পানির উৎস দূরে, কোথাও পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও কিছু প্রকল্পে সরবরাহ বা অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। এসব সমস্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নারী, শিশু ও বয়স্কদের ওপর। অসুস্থ কাউকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হলে দূরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়। শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।
