প্রেমের বিয়ে, ছয় বছরের সংসার; ১৯ বছরেই স্বামীর হাতে খুন লামিয়া

প্রেমের বিয়ে, ছয় বছরের সংসার; ১৯ বছরেই স্বামীর হাতে খুন লামিয়া

শরীয়তপুরের ডামুড্যায় পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন লামিয়া আক্তার (১৯) নামে এক তরুণী। মাদক সেবন ও ব্যবসায় জড়িত স্বামীর সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। মায়ের মৃত্যুর পর মাত্র দুই বছর চার মাস বয়সী ছেলে রাফসান এখন মা-হারা।

সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কনেশ্বর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত লামিয়া আক্তার উপজেলার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সুতল কাঠি গ্রামের আল আমিন মাদবরের বড় মেয়ে। ২০১৯ সালে তিনি কনেশ্বর ইউনিয়নের মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। ওই সময় মাদ্রাসায় যাতায়াতের পথে একই ইউনিয়নের কনেশ্বর গ্রামের আজগর আলী ছৈয়ালের ছেলে রবিউল ছৈয়াল (২৫) তাঁকে বিভিন্ন সময় উত্ত্যক্ত করতেন।

একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে একসঙ্গে ঘুরতে গিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়লে ২০১৯ সালে স্থানীয়রা তাঁদের বিয়ে দেন। তবে ওই বিয়ের কোনো নিবন্ধন করা হয়নি।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই রবিউল মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ও জড়িয়ে পড়েন তিনি। এ নিয়ে সংসারে অশান্তি শুরু হয়। স্বামীকে মাদক সেবন ও ব্যবসা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করায় লামিয়ার সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে স্বামীর হাতে প্রাণ দিতে হয় তাঁকে।

নিহত লামিয়ার বাবা আল আমিন মাদবর বলেন, ২০১৯ সালে তাঁর মেয়ে মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন। তখন বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। ওই সময় থেকেই রবিউল বিভিন্ন জায়গায় মেয়েকে উত্ত্যক্ত করতেন, প্রেমের প্রস্তাব দিতেন এবং ভয়ভীতি দেখাতেন। একপর্যায়ে মেয়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। পরে একসঙ্গে ঘুরতে গিয়ে স্থানীয়দের মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে হয়। এরপর তিনি তাঁদের সম্পর্ক মেনে নেন।

তিনি আরও বলেন, পরে জানতে পারেন, তাঁর জামাতা রবিউল ইয়াবা ব্যবসা ও মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তিনি মেয়েকে নির্যাতন করতেন। ভয়ে লামিয়া এসব কথা পরিবারের কাছে জানাতেন না। মাঝেমধ্যে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মেয়েকে মারধরও করতেন রবিউল।

আল আমিন মাদবর জানান, তাঁদের মেয়ের ঘরে দুই বছর চার মাস বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। মাদক সেবন ও ব্যবসা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে বিরোধের জেরে ১ নভেম্বর ছেলে রাফসানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন লামিয়া।

পরদিন সকালে রবিউল শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে ফিরিয়ে নিতে যান। লামিয়া যেতে রাজি না হওয়ায় কাউকে কিছু না জানিয়ে ছেলে রাফসানকে নিয়ে চলে যান তিনি।

এ ঘটনায় কান্নাকাটি করে ওই দিন ডামুড্যা থানায় গিয়ে সন্তানকে ফিরিয়ে আনার জন্য অভিযোগ করেন লামিয়া। সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ মীমাংসা করে দেন। এরপর রবিউল লামিয়ার কাঁধে হাত রেখে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

পথে তাঁদের বাড়ির ঘাটের কাছে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অন্ধকারের মধ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে লামিয়ার গলায় আঘাত করে পাশের ডোবায় ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁর বাবা। এ সময় লামিয়ার হাত-পায়ের রগও কেটে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।

আল আমিন মাদবর বলেন, তাঁর ছোট ছেলে ঘটনাটি দেখে দৌড়ে এসে তাঁকে খবর দেয়। পরে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লামিয়াকে রক্তাক্ত অবস্থায় ডোবার পাশে পড়ে থাকতে দেখেন। লামিয়ার শাশুড়িসহ পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি আরও জানান, মেয়েকে হত্যার পর রবিউল থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন বলে তাঁরা জানতে পারেন। হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। লামিয়ার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন তিনি।

তবে ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রবিউল আত্মসমর্পণ করেননি। স্ত্রীকে হত্যার পর তিনি থানার আশপাশে ঘোরাফেরা করছিলেন। তাঁর চলাফেরা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় পুলিশ তাঁকে থানায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে লামিয়া হত্যার রহস্য বেরিয়ে আসে। এ ঘটনায় লামিয়ার বাবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

rumaakter144e@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *