সাজেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, পর্যটকদের বুধবারের মধ্যে এলাকা ছাড়ার অনুরোধ
রাঙামাটি প্রতিনিধি
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বুধবারের মধ্যে পর্যটনকেন্দ্রটি ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেল ৪টার দিকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেন সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়ায় আবারও অবরোধ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর সকাল থেকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে সংগঠন দুটি। ওই দিন বিকেলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হলে অবরোধ স্থগিত করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে ১৫ অক্টোবর আবারও অবরোধ শুরু হয়।
পরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাঘাইহাট ও মাচলং বাজার দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির অনুরোধে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসবের প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছিল। সেই বিরতির পর বৃহস্পতিবার থেকে আবারও অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হলো।
সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ
যৌথ বিবৃতিতে সংগঠন দুটির নেতারা অভিযোগ করেন, জেএসএসের সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা এখনো সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। তাঁদের দাবি, সশস্ত্র গ্রুপের কোম্পানি কমান্ডার চিনু মারমা ও সাইমন চাকমার নেতৃত্বে মাচলং এলাকার থালকুম্ভো, চিল্ল্যাতুলি কুটির, নোয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভুয়োছড়িতে প্রকাশ্যে সশস্ত্র তৎপরতা চলছে।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, সশস্ত্র সদস্যরা শতাধিক সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করেছেন। এ ছাড়া গ্রামবাসীর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
সংগঠন দুটির দাবি, নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাধারণ জুমচাষিরা জুমে হলুদ ও ঝাড়ুফুলের বাগান পরিষ্কারের কাজেও যেতে পারছেন না। এলাকাবাসীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্ত সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে জানিয়েছে তারা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আগের অবরোধে ভোগান্তিতে বাসিন্দা ও পর্যটক
এর আগে অবরোধের কারণে সাজেকের স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার জোড়াব্রীজ থেকে সাজেক ভ্যালি পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। হাটের দিনেও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি কমে যায়। পরিবহনসংকটে জুমের ফসল বিক্রি করতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েন স্থানীয় চাষিরা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্যসংকটও দেখা দিতে পারে। আগের কর্মসূচিতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় সাজেক ইউনিয়নের লুসাই, ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন বলে পুলিশ জানিয়েছিল।
আগের অবরোধে সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের ফিরিয়ে নিতে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় গাড়িবহর চলাচলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা গাড়িবহর আটকে দেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনার পর পর্যটকবাহী গাড়িবহর চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়।
এ পরিস্থিতিতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। পরে ১৫ অক্টোবর সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। নতুন করে অবরোধের ঘোষণা আসায় সাজেকের সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটন কার্যক্রম আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
জরুরি যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত
বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অবরোধ চলাকালে জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও মরদেহবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন, সংবাদপত্র বহনকারী গাড়ি এবং সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের যানবাহন কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে।
তবে অবরোধের কারণে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াত কতটা ব্যাহত হবে, তা নির্ভর করবে কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও পরিস্থিতির ওপর।
