১৬ বছরে যারা গুম-খুনের বৈধতা দিয়েছে, তাদেরও শনাক্ত করতে হবে : শফিকুল আলম

১৬ বছরে যারা গুম-খুনের বৈধতা দিয়েছে, তাদেরও শনাক্ত করতে হবে : শফিকুল আলম

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ১৬ বছরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধকে যারা বৈধতা দিয়েছে, তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

তিনি বলেছেন, শুধু জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলো নয়, গত ১৬ বছরে এসব অপরাধের পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছেন বা সেগুলোকে বৈধতা দিয়েছেন, তাদেরও চিহ্নিত করে যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করতে হবে।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মঞ্চ ২৪ আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অনৈক্য ও বাংলাদেশের ক্ষতি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ের সময় যারা অস্ত্র ও লাঠিসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় নেমেছিল, তাদের প্রত্যেককে শনাক্ত করে প্রোফাইল তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গত ১৬ বছরে যারা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের বৈধতা দিয়েছে, তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। এসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে দেশে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকানো সম্ভব হবে।

জুলাইয়ের আন্দোলনকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক এই প্রেস সচিব বলেন, জুলাইকে ঘিরে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিটি বাস্তবায়ন হবে। অনেকে ভাবছেন, জুলাইয়ের ঐক্য কিছুটা হলেও ভেঙে গেছে। আমি মনে করি না, জুলাইয়ের ঐক্য ভেঙেছে। জুলাইকে ঘিরে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আমি মনে করি প্রত্যেকটাই বাস্তবায়ন হবে। আজকে হচ্ছে না, কিন্তু কালকে হবে। এটা হতেই হবে এবং আমি নিশ্চিত, এটা হবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ৫০০ দিনে ১৩৩টি আইন করেছে। সংস্কারকে সামনে রেখে এসব আইন করা হয়েছে। তখন সংসদ না থাকায় উপদেষ্টারা প্রতিটি আইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কোনো কোনো দিন মন্ত্রিসভায় চার থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত একটি আইন নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জুলাইয়ের আন্দোলনকে ‘জনযুদ্ধ’ ও ‘মহৎ বিপ্লব’ আখ্যা দিয়ে শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, মানুষ রাস্তায় নেমে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এর চেয়ে মহৎ বিপ্লব আর হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগে পুলিশ সদস্যদের প্রতিরোধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা যেভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন, জুলাইয়েও বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ একইভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। রামপুরা, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও মাতুয়াইলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ আন্দোলনে নেমেছিল।

শফিকুল আলম বলেন, দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় তখন আন্দোলনের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী এতে অংশ নিয়েছিলেন। আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক জায়গায় নারীরা সামনের সারিতে ছিলেন এবং আন্দোলনকারীদের সুরক্ষা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, এটা বিপ্লব ছিল। আমি জুলাইকে বিপ্লব বলছি। কারণ, জুলাই বাংলাদেশকে খোলনলচে পাল্টে ফেলার একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষার জন্য সবাই রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। লাখ লাখ মানুষ নেমেছিল। বাংলাদেশের এমন কোনো জায়গা বা শহর ছিল না, যেখানে মানুষ নামেনি।

জুলাইয়ের অনেক সংস্কার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, এ ক্ষেত্রে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো জুলাইয়ের সময়ের সব ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা। আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী অস্ত্র ও লাঠিসহ আন্দোলনে নেমে সাধারণ মানুষকে হত্যার চেষ্টা করেছেন, তাদের প্রত্যেককে শনাক্ত করে প্রোফাইল তৈরি করা প্রয়োজন।

এ জন্য আলাদা একটি সংস্থা বা এনফোর্সিং এজেন্সি গঠনের দাবি জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, আপনারা অনেকে ভাবছেন, এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করুক। তবে আমাদের সবার মিলে দাবি করা উচিত, এ জন্য একটি আলাদা সংস্থা করা হোক। আলাদা এনফোর্সিং এজেন্সি হোক। এই লোকগুলোকে ট্র্যাক ডাউন করা, আইডেন্টিফাই করা এবং প্রত্যেকের প্রোফাইল তৈরি করা হোক।

জুলাইয়ের সময় কে কোথায় ছিলেন এবং কোন জেলা থেকে আন্দোলনে নেমেছিলেন, এসব তথ্যও নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মাগুরার প্রসঙ্গ টেনে শফিকুল আলম বলেন, ওই জেলার অনেক মানুষ আন্দোলনে নেমেছিলেন। তার দাবি, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাবাও আওয়ামী লীগের হয়ে অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন।

জুলাইয়ের সময়কার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে ভিডিওর মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা কঠিন নয়। তাই ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন।

মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকীর সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন- দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও লেখক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

rumaakter144e@gmail.com

Related articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *